, | |

মূলপাতা আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, ইরান বলছে ভুয়া খবর: কার কথা সত্য?


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :২৫ মার্চ, ২০২৬ ৪:২১ : অপরাহ্ণ

যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে আলোচনা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রদান করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তেহরান বলছে ভুয়া খবর। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী বক্তব্য প্রদানের ফলে বাস্তবে কী ঘটছে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। আর এই দ্বৈত অবস্থানের পেছনে রয়েছে কৌশল, অর্থনীতি ও যুদ্ধের বাস্তব হিসাব-নিকাশ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে, আর সেখানেই লুকিয়ে আছে এই দ্বন্দ্বের আসল ব্যাখ্যা।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, প্রায় এক মাস আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করা এই যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আলোচনা হয়েছে।

তবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার তা অস্বীকার করেছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বিভিন্ন পক্ষের প্রচারণার কারণে কাকে বিশ্বাস করা উচিত তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে কোন পক্ষ আলোচনায় কী লাভ দেখছে, তা বিশ্লেষণ করলে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

ট্রাম্প বলছেন, এক অজ্ঞাতনামা শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনায় ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা’ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার সময় এই মন্তব্যটি করেছেন তিনি।

ইরানের জন্য তিনি যে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, সেটিও আবার শেয়ারবাজারের সপ্তাহের শেষের সঙ্গে মিলে যায়। অনেকে মনে করছেন, এই সময় বেছে নেয়াটা কাকতালীয় নয়, বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী তেলের দাম ওঠানামা করে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছানোর পর।

আলোচনার কথা বলে ট্রাম্প হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠানোর সময় নিচ্ছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। ভুয়া খবর ছড়িয়ে আর্থিক ও তেলের বাজার প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সংকটে পড়েছে, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা হচ্ছে।’

শেয়ারবাজার ও তেলের দামের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে তেহরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতিই তাদের জন্য লাভজনক। ইরান চায়, এই যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে চাপ অনুভব করুক, যাতে ভবিষ্যতে তারা আর ইরানের বিরুদ্ধে হামলার সাহস না পায়।

এ কারণে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আলোচনার কথা তুলে বাজার স্থিতিশীল রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইরানের জন্য এসব আলোচনা অস্বীকার করে উল্টো চাপ বাড়ানোই লাভজনক। ফলে দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে বার্তা দিচ্ছে, আর প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে না আসলে আলোচনা হচ্ছে কি না, বা হলেও সেটা কীভাবে হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে-এই মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ হলে কে কী পাবে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করার পর এর পরিণতি ট্রাম্প হয়তো পুরোপুরি অনুমান করতে পারেননি। ইরান যে ভেঙে পড়বে না এবং পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, তা অনেকেই আগেই সতর্ক করেছিলেন।

ট্রাম্প নিজেও গত সপ্তাহে বলেন, ‘তারা (ইরান) মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকেও আক্রমণ করবে, এটা কেউ ভাবেনি’। বাস্তবতা এখন তাকে বুঝতে বাধ্য করেছে, যুদ্ধের মূল্য কতটা বড় হতে পারে।

একদিকে কিছু মিত্র তাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে অতীতে ট্রাম্প জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হতে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছেন-এ ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এরই মধ্যে তিনি ইরানের কিছু তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে বাজারে দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। ২০১৯ সালের পর এটাই প্রথম এমন পদক্ষেপ।

ইরানও বুঝছে, এই ছাড় এসেছে তাদের কৌশলের কারণে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ানোর ফলে। যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল না, আর এখন জ্বালানির দাম বাড়ায় জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়ছে। সামনে কংগ্রেস নির্বাচন, এতে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের ফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ আছে। আর তা হচ্ছে-যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, অথবা যুদ্ধ শেষ করে সমালোচনার মুখে পড়া। তবে সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তার হাতে নেই।

এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো হামলার শিকার হওয়া ইরান এখন এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে ভবিষ্যতের হামলা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া তারা যুদ্ধ থামাতে আগ্রহী নয়। আগের মতো সীমিত প্রতিক্রিয়া নয়, এই যুদ্ধে শুরু থেকেই ইরান কৌশল বদলে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের জন্য এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করাও লাভজনক হতে পারে, যদি এতে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে। এছাড়া ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতাও কমে আসছে—এমন ধারণাও থাকতে পারে। আর সেটিও ইরানকে আরও আক্রমণ চালাতে উৎসাহিত করছে।

তবে ইরানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটিতে ১৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঝুঁকিতে রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়েছে।

এই বাস্তবতায় ইরানের মধ্যপন্থিরা মনে করতে পারেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই আলোচনায় বসা উচিত। এছাড়া যদি তারা ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা বা হরমুজ প্রণালিতে বেশি নিয়ন্ত্রণের মতো কিছু ছাড় পায়, তাহলে সমঝোতার পথেও যেতে পারেন তারা।

আরও পড়ুন:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৫ কঠিন শর্ত

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কাছে ১৫ দফার প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কী আছে এতে?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর