চার দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল ধর্মঘট চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। কিন্তু একদিন না যেতেই লেজ গুটিয়ে পিছু হটলেন হুংকার দেওয়া আন্দোলনকারী নেতারা। গতকাল রোববার সকাল থেকে শুরু করা এই ধর্মঘট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় স্থগিতের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহীম খোকনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজানে পণ্য খালাসের স্বার্থে ধর্মঘট কর্মসূচি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। তবে বন্দর কর্মচারীদের গ্রেপ্তার, হয়রানিমূলক বদলি, সাময়িক বরখাস্তসহ পাঁচটি সমস্যা সমাধান না হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি আবার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এর আগে গত শনিবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিলসহ চারটি দাবি জানায়। বাকি তিনটি দাবি হচ্ছে-বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করা; বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করা; এবং আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ কোনোরূপ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
জানা গেছে, অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করায় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আন্দোলনরত কর্মচারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মচারী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আন্দোলন করার সক্ষমতা যদি না থাকে তাহলে তারা কেন অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করলো? এখন লেজ গুটিয়ে কেন এ কর্মসূচি থেকে সরে আসলো?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের আরেক কর্মচারী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাবে। তখন আন্দোলনের আর কোনো সুযোগ থাকবে না। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়কের অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার কারণে এই আন্দোলন ব্যর্থ হলো। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে যেসব কর্মচারী এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল তারা এখন উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকবে।
এর আগে গতকাল রোববার বিকেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা চুক্তি হচ্ছে না। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসলে এই চুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড আমাদের কাছে একটু সময় চেয়েছে। কিন্তু আমাদের হাতে মাত্র ২টি কার্যদিবস বাকি আছে। তাই এ সময়ের মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা চুক্তি হচ্ছে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মচারী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, বিডা চেয়ারম্যানের এ ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন মাঠে মারা গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করে আসছিল বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গত ২ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের দুই সমন্বয়কারীসহ ১৫ শ্রমিক-কর্মচারীকে পায়রা ও মোংলা বন্দরে বদলি করে কর্তৃপক্ষ। পরে এরমধ্যে ১৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর জেরে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে বন্দরের শ্রমিকরা। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসহ বন্দরের প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে আসেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দফায় দফায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বিকেলে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ দুদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
তবে ওইদিন আবার বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত ১৫ শ্রমিক নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করে। পাশাপাশি তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে অবহিত করার অনুরোধ করা হয়। এরপর তাদের বাসা বরাদ্দও বাতিল করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এর প্রতিবাদে গত ৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ রোববার থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচির ডাক দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রোববার সকাল থেকে বন্দরের বিভিন্ন জেটি, টার্মিনাল, কনটেইনার ডিপো, বহির্নোঙরসহ বন্দরের সব স্থানে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারা চুক্তি হচ্ছে না
