বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১৩ ফাল্গুন, ১৪৩২ | ৮ রমজান, ১৪৪৭

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

জিম্মি শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশন!



রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশের সময় : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:০২ অপরাহ্ণ

একটি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে জাহাজভাঙা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। সংগঠনটির তফসিল ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হয়নি। দায়িত্ব পালন করতে না পেরে ইস্তফা দিয়েছে নির্বাচন বোর্ড। এরপর নিয়মভঙ্গ করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় আমজাদ চৌধুরীকে। শেষ পর্যন্ত সংগঠনটির অনিয়মের রাশ টেনে ধরেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিটিও) মুহাম্মদ রেহান উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের সচিব আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহে দুল ইসলামকে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওই অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশন বাণিজ্য সংগঠন আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে না। আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার বিষয়টি সংঘবিধি পরিপন্থী হয়েছে।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনে ১১টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দেন ১১ জন। এদের মধ্যে সভাপতি প্রার্থী ছিলেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থী ছিলেন মো. মহসিন চৌধুরী (পিএইচপি ফ্যামিলি) এবং দুজন সহসভাপতি প্রার্থী ছিলেন নাওসির হাসান (ক্রিস্টাল সিপার্স) ও গাজী মোকারম আলী চৌধুরী (চিটাগাং শিপব্রেকিং)।

সাতজন নির্বাহী সদস্য প্রার্থী ছিলেন-হোসাইনুর আরেফীন (জনতা স্টিল), এস এম নুরুন নবী (বিওবি), নুর উদ্দিন রুবেল (ফোর স্টার স্টিল এন্টারপ্রাইজ), মো. তসলিম উদ্দিন (কে.আর গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং), ফেরদৌস ওয়াহিদ (ফেরদৌস স্টিল), মো. সেলিম উদ্দিন (খাজা আজমীর) এবং ইয়ামিন ওবাইদা আসাদী (প্রগ্রেসিভ শিপ রিসাইক্লিন)।

এসব প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে ১৫ সেপ্টেম্বর ‘স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন’ করতে না পারার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দেয় নির্বাচন বোর্ড। ফলে আর নির্বাচন হয়নি।

পদত্যাগ করার কারণ জানতে চাইলে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘ওখানে সঠিক নিয়মে সবকিছু হচ্ছিলো না। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারিনি। প্রার্থীরা আমাদের সহযোগিতা করেনি। তাই নিজের সম্মান নিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের অনেকে ঋণখেলাপী ছিলেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ঋণ রিসিডিউল করে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমজাদ চৌধুরী ঋণ রিসিডিউল করে আনতে পারেননি। তিনি ঋণ রিসিডিউল করেছেন বলে দাবি করেছিলেন। এটা নিয়ে তখন বিতর্ক সৃষ্টি হলে আমি পদত্যাগ করে চলে আসি।’

অভিযোগ পাওয়া গেছে, নির্বাচন ভেস্তে যাওয়ার পর শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটি একটি চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। বিদ্যমান নির্বাহী কমিটির মেয়াদ ছিল গত ৯ নভেম্বর পর্যন্ত। সংগঠনটির সভাপতি আবু তাহের ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য দিদারুল আলম দিদারের বাবা ও সাবেক সিটি মেয়র মনজুর আলমের ভাই। আবু তাহের পদত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন সিনিয়র সহসভাপতি লিয়াকত আলী চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের শিল্পপতি শওকত আলী চৌধুরীর (ডিসকো শওকত) ছোট ভাই।

নির্বাচন ভেস্তে যাওয়ার পর লিয়াকত আলী চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর গত ৩ নভেম্বর এক সভায় আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। তিনি সীতাকুণ্ড আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই। আমজাদ চৌধুরী সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাকে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের পরিবর্তে নিযুক্ত করা হয়।

অভিযোগ উঠে, সংগঠনের সংঘবিধি লঙ্ঘন করে সিনিয়র সহসভাপতির পরে দুই সহসভাপতিকে বাদ দিয়ে আমজাদ চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। দুই সহসভাপতি হলেন-পিএইচপির পরিচালক জহিরুল ইসলাম রিংকু ও কেএসআরএমের ডিএমডি করিম উদ্দিন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমজাদ হোসেন চৌধুরী রাজনীতি সংবাদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘সংঘবিধির কোথায় লেখা আছে যে, নির্বাহী সদস্য ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হতে পারবে না?’

আপনাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে কেন ‘সংঘবিধি পরিপন্থী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে?-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে এর ব্যাখ্যা চাইবো। শুধু তাই নয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসক নিয়োগের আদেশ ব্যাকেটের জন্য আমি হাইকোর্টে আবেদন করেছি।’

শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সাবেক একজন নির্বাহী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, একটি চক্র শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনকে জিম্মি করে ফেলেছে। সংগঠনের সংঘবিধি লঙ্ঘন করে আমজাদ চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হলেও সভায় কেউ টু শব্দ করতে পারেননি। সবাই মাথা নিচু করে রেখেছিলেন।

আমজাদ চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নেন ৩ নভেম্বর আর কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ৯ নভেম্বর। মাত্র ৬ দিনের জন্য কেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি?

শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সাবেক একজন নির্বাহী সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, তিনি (আমজাদ চৌধুরী) ৫ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন বোর্ড গঠন করে ভোটের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তিনি সেটা করতে পারেননি।

জানা গেছে, নবনিযুক্ত প্রশাসক ৯০ দিনের মধ্যে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের আয়োজন করবেন।

শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনে দুই বছর মেয়াদের জন্য সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও দুজন সহসভাপতি এবং সাতজন নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন। সংগঠনটির ভোটার রয়েছেন ৪৬ জন।

উল্লেখ্য, গত ৮ বছর চার মেয়াদে শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের নির্বাচনে ভোট হয়নি। বিনাভোটে এসোসিয়েশনের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছিলো। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আবু তাহের একটানা ৯ বছর বিনাভোটে সভাপতির পদ আঁকড়ে রেখেছিলেন।

আরও পড়ুন:

ডা. শাহাদাত আর কতদিন মেয়র পদে থাকতে পারবেন?

আটকে গেলো শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের ভোটের চূড়ান্ত ফল

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর