চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি। আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পূর্বে নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার নির্ধারিত সময়ে চসিক নির্বাচন হচ্ছে না।
এ অবস্থায় ডা. শাহাদাতের মেয়র পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কী হবে? ডা. শাহাদাত কি মেয়র পদে বহাল থাকবেন নাকি প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে? এ নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব পড়েছে।
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল। ৮ অক্টোবর ডা. শাহাদাতকে সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত করে সংশোধনী গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ৩ নভেম্বর মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ডা. শাহাদাত। ৫ নভেম্বর তিনি মেয়রের দায়িত্ব নেন।
আইন অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ ধরা হয় প্রথম সাধারণ সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৬ষ্ঠ নির্বাচিত পরিষদের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রথম সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে রেজাউল করিমের স্থলাভিষিক্ত হওয়া ডা. শাহাদাত হোসেনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি।
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও উহা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করিয়া যাইবে।’ অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি নির্বাচন না হয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বর্তমান মেয়র দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
কিন্তু এই ধারা নিয়ে আইনি জটিলতার মুখে পড়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর কারণ হলো, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নামে হলেও বাস্তবে সংস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়।
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ধারা ৫ (১) এর উপ-ধারা (ক, খ,গ) অনুযায়ী, মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরদের সমন্বয়ে সিটি কর্পোরেশন গঠিত হইবে।
কর্পোরেশন গঠনের শর্ত হিসেবে এই আইনের ৫ নম্বর ধারার ৩ নম্বর উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ভোটের মাধ্যমে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচিত হবে এবং তা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হতে হবে।
কিন্তু ডা. শাহাদাত হোসেন মেয়র হয়েছেন আদালতের রায়ে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সকল কাউন্সিলরদের অপসারণ করে। এখন সিটি কর্পোরেশন পরিচালনা করছেন মেয়র একাই।
এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারাটা মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব পড়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: রেজাউল মাকছুদ জাহেদী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আইনে বলা আছে, যদি নির্বাচন না হয় সেক্ষেত্রে বর্তমান মেয়র পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু ডা. শাহাদাত হোসেন মেয়র হয়েছেন আদালতের রায়ে। এ ছাড়া সিটি কর্পোরেশনে এখন কোনো কাউন্সিলর নেই। ফলে এই আইন তার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আইনগত দিক খতিয়ে দেখছি।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে কোনো কাউন্সিলর নেই। মেয়র একাই আছেন। কেবল মেয়র দিয়ে সিটি কর্পোরেশন হয় না। সিটি কর্পোরেশন যদি না থাকে, তাহলে বর্তমান মেয়রের মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ৬ নম্বর ধারাটা কীভাবে প্রযোজ্য হবে? এই আইনি জটিলতার বিষয়ে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে তিনি হয়তো এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সম্মতি নেবেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা জানান, যদি আইনি বাধার কারণে বর্তমান মেয়রের মেয়াদ বৃদ্ধি করা না যায়, তাহলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪ এর ধারা ২৫ক–এর উপ-ধারা (১) অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার অত্যাবশ্যক বিবেচনা করলে, জনস্বার্থে কোনো সিটি কর্পোরেশনে নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করে অথবা পরবর্তী আদেশ না হওয়া পর্যন্ত উহার কার্যাবলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে, একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত উপযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করতে পারবে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটের সময় হামলা, গোলাগুলি, প্রাণহানি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। ভোটগ্রহণ শেষে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫৯ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। রেজাউলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পেয়েছেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। এরপর ডা. শাহাদাত আদালতের দ্বারস্থ হন। ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল বাতিল চেয়ে ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা ঠুকে দেন তিনি। মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিমসহ ৯ জনকে বিবাদী করা হয়।
আরও পড়ুন: পলোগ্রাউন্ডের জনসভায় দুই বিএনপি নেতার ‘ষড়যন্ত্রের মিশন’ ব্যর্থ!
