গুমের সময় জমটুপি পরানোর আগে দায়িত্বরত সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখছুরুল হককে দেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী।
জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে তিনি এ কথা জানান।
আজ রোববার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। আযমী এ মামলার তিন নম্বর সাক্ষী।
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার আযমী বলেন, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টায় বড় মগবাজারে আমার বাসার সামনে অনেকগুলো মাইক্রোবাসসহ সাদা পোশাকে ৫০-৬০ জন লোক আসেন। তাদের বেশকিছুসংখ্যক আমার বাসায় ঢোকেন। ওই সময় কিছু জিজ্ঞেস না করেই হাতকড়া পরাতে হাত এগিয়ে দিতে বলেন তারা। কিন্তু আমি তাদের পরিচয়পত্র ও কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কি না দেখতে চাই। জানতে চাই তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক কি না। জবাব না দিয়ে উত্তেজিতভাবে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে আমাকে বারবার হাত দেওয়ার জন্য বলতে থাকেন তারা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছিল তারা আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করবে। এতে নিরুপায় হয়ে দুই হাত এগিয়ে দেই।
ভুক্তভোগী এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, হাত এগিয়ে দেওয়ার পর প্রথমে হাতকড়া পরানো হয়। এরপর চোখ বেঁধে লিফটে করে নিচে নামিয়ে তোলা হয় মাইক্রোতে। গাড়িতে তুলে জমটুপি পরিয়ে দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর তারা আমাকে নিয়ে রওনা করেন। তবে যখন জমটুপি পরায়, তখন চোখের বাঁধন সামান্য নেমে যায়। এতে আমি বাইরের আলো সামান্য দেখতে পাচ্ছিলাম। ফলে জমটুপি পরানোর আগে আমাকে অপহরণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মখছুরুল হককে দেখে চিনে ফেলি। আমার জানা ছিল তিনি ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তা। আমি মখছুরুলকে চিনলেও বুঝতে দেইনি। কারণ তা জানলে আমার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে বলে মনে করেছিলাম। এ কর্মকর্তা আমার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। তুই-তোকারি করেন।
ব্রিগেডিয়ার আযমী বলেন, মুক্তির পর জানতে পারি যারা আমার বাড়ি এসেছিল, তারা সব স্টাফকে শারীরিক নির্যাতন করে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ বাসার যুবতী গৃহপরিচারিকার গায়ে হাত তোলে। ম্যানেজারকে মাটিতে ফেলে ওপরে উঠে লাফালাফি করেন তারা। এ ছাড়া বাসার বিভিন্ন আলমারির তালা ভেঙে তল্লাশি চালান। এমনকি স্ত্রীকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। স্ত্রী তখন আমার মায়ের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘আমাকে নিতে হলে, আমার মাসহ নিতে হবে’। এরপর তারা আমার স্ত্রীকে আর কিছু বলেননি। পরে বাসা থেকে কয়েকটি মোবাইল ও বেশকিছু কাগজপত্র নিয়ে যায়। তারা এলাকার সব সিসি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে সিসিটিভির রেকর্ড নিয়ে যায়। এক কথায় পুরো এলাকায় তারা ত্রাস সৃষ্টি করে আমাকে নিয়ে যায় সেদিন। ওইদিন মগবাজার ফ্লাইওভার দিয়ে মহাখালীসহ র্যাব সদর দপ্তর হয়ে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করেন তারা। এরপর ডিজিএফআইয়ের কমপ্লেক্সে নিয়ে গাড়ি থেকে নামানো হয়। একপর্যায়ে একটি সেলে ঢুকিয়ে হাতকড়া ও চোখের বাঁধন খুলে দেন তারা। সেখানেই দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়।
এদিন আযমীর সাক্ষ্যগ্রহণ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা।
আরও পড়ুন: গুমের নির্দেশ দিতেন হাসিনা, বাস্তবায়ন করতেন তারিক সিদ্দিক
