চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন নিয়ে প্রেস্টিজ ইস্যুতে জড়িয়েছেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের দুই শীর্ষ নেতা। এরা হলেন-আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ও এস এম নুরুল হক। আমীর হুমায়ুন নির্বাচনে না লড়লেও একটি প্যানেল পরিচালনা করছেন। আর নুরুল হক একটি প্যানেলের লিডার। তবে নির্বাচনী লড়াইয়ের আগে দুই প্যানেলের এই দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে এখন আইনি লড়াই চলছে।
নির্বাচনে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ নামের একটি প্যানেলের উপদেষ্টা আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। এই প্যানেলের লিডার হলেন চট্টগ্রামের খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক। অপরদিকে ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’ নামের অপর একটি প্যানেলের লিডার হলেন এস এম নুরুল হক।
আমীর হুমায়ুন চেম্বারের সাবেক সভাপতি আর নুরুল হক সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। আমীর হুমায়ুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছোট ভাই আর নুরুল হক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হকের ছোট ভাই।
আমীর হুমায়ুন ও নুরুল হক বিএনপি পরিবারের সদস্য হলেও তাদের সম্পর্ক ‘সাপে-নেউলে’। আমীর হুমায়ুনের সঙ্গে ‘বিরোধের জেরে’ প্যানেল নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন নুরুল হক। আমীর হুমায়ুনের প্যানেলকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। এই দুই ব্যবসায়ীর মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের কারণে আইনি মারপ্যাঁচে আটকে গেছে চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন।
দীর্ঘ ১০ বছর পর গত ১ নভেম্বর চিটাগাং চেম্বারের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোটের দুই দিন আগে নির্বাচন আটকে যায়। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চেম্বারের নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেয়।
চেম্বারের নির্বাচনে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে তিনজন করে মোট ছয়জন পরিচালক প্রার্থী হন। কিন্তু তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকে না। তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ চেম্বারের ‘পকেট ভোট’ নামে পরিচিত।
গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না দিতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু ১৪ দিন পর গত ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেয়।
চিটাগাং চেম্বারের মোহাম্মদ বেলাল নামের একজন অর্ডিনারি মেম্বার টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ ইস্যুতে গত ১৯ অক্টোবর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তিনি এই রিট দায়ের করেন।
গত ২২ অক্টোবর হাইকোর্টে এই রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ স্থগিত করে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ ছাড়া নির্বাচন করার আদেশ দেয়। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই রিটের বিরুদ্ধে আপিল করে। গত ৩০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন স্থগিতের আদেশ দেয়। গত ২০ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে এই রিটের দুই দফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আগামী ১১ ডিসেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেছে হাইকোর্ট।
চিটাগাং চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার বেলাল হাইকোর্টে রিট করে চেম্বারের নির্বাচন আটকে দিলেও তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তবে তার ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব নির্বাচনে ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’ প্যানেল থেকে পরিচালক প্রার্থী হয়েছেন।
চেম্বারের ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, নির্বাচনে আমীর হুমায়ুন চৌধুরীর ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামকে ঠেকাতে প্রতিপক্ষ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। কারণ টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে ছয়জন পরিচালক প্রার্থী হয়েছে আমীর হুমায়ুনের প্যানেল থেকে। তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। এতে ভোটের আগে ২৪টি পরিচালক পদের মধ্যে ৬টি বাগিয়ে নিয়েছে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম। নির্বাচন হবে অর্ডিনারির ১২টি ও অ্যাসোসিয়েটের ৬টি পরিচালক পদে। এর মধ্যে ৭টি পদ পেলে চেম্বারের নেতৃত্বে আসবে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম। কিন্তু নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদকে চেম্বারের নেতৃত্বে আসতে হলে ১৮টি পদের মধ্যে ১৩টিতে বিজয়ী হতে হবে। যা অনেকটা দুঃসাধ্য। এজন্য নির্বাচনের আগে আমীর হুমায়ুনকে আইনের মারপ্যাচে আটকানো হয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে হাইকোর্টে রিটের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের উপদেষ্টা আমীর হুমায়ুন চৌধুরী ও সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক। টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ছয় পরিচালক প্রার্থীকে রিটে বিবাদী করায় আমীর হুমায়ুন ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের উপদেষ্টা হিসেবে রিটের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নুরুল হকের রিটের শুনানিতে উপস্থিত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন চেম্বারের ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, হাইকোর্টের এজলাসে এক ঘন্টা বসে রিটের শুনানি শুনেছিলেন নুরুল হক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন রিট আবেদনকারী মোহাম্মদ বেলাল।
গত ৩০ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লুতে সংবাদ সম্মেলন করে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, স্বার্থান্বেষী মহলের গভীর চক্রান্তে চেম্বারের নির্বাচন স্থগিত হয়েছে।
এরপর গত ১ নভেম্বর সকালে নগরীর আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ। মানববন্ধনে এই প্যানেলের ব্যবসায়ীরা নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের প্রতীকী ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন করেন।
অথচ যে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে, সেই রিট আবেদনকারী বেলালের সঙ্গে হাইকোর্টে শুনানিতে হাজির হন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্যানেল লিডার নুরুল হক।
ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, এটা নুরুল হকের ‘স্ববিরোধী অবস্থান’। তিনি একদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের প্রতীকী ‘লাল কার্ড’ দেখিয়েছেন, অন্যদিকে হাইকোর্টে গিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণা।
হাইকোর্টে কেন গিয়েছিলেন-এই প্রশ্নের জবাবে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘হাইকোর্টে আমি গিয়েছি, কারণ আমি এটার শেষ দেখে ছাড়বো।’
আপনি কি রিট আবেদনকারীর (মোহাম্মদ বেলাল) পক্ষ হয়ে হাইকোর্টে গিয়েছেন-এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি রিট আবেদনকারীর পক্ষে গিয়েছি সেটা আপনাকে কে বলেছে? আমরা ইলেকশনে একটা প্যানেল দিয়েছি। হাইকোর্টে ইলেকশন নিয়ে কী হচ্ছে তা শুনতে আমি সেখানে গিয়েছি। আর আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী গেছে না? তাহলে আমি গেলে অসুবিধা কোথায়?’
নুরুল হকের বিষয়ে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ প্যানেলের উপদেষ্টা আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘‘নুরুল হক ১৭ বছর লতিফের (চট্টগ্রাম-১১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি) তরফদারি করেছে। লতিফের এক ছেলে আমার কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, ‘তিনি (নুরুল হক) প্রায় প্রতিদিন আমার আব্বার সঙ্গে লেগে থাকতেন। একটেবিলে বসে ভাত খেতেন। তার জন্য আমরা আমার আব্বার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না। আজকে তিনি আমার বাবার বিরুদ্ধে কথা বলেন।’’
‘এই নুরুল হক সম্পর্কে কী বলবেন?’-প্রশ্ন রাখেন আমীর হুমায়ুন চৌধুরী।
চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন চৌধুরী বলেন, ‘‘নুরুল হক ২০০৮ সালে চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আমাকে ফোন করেছিলো। বলেছিলো, ‘আপনি একটু লতিফকে বলেন, যেন জাভেদ (চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ) আমাকে প্রেসিডেন্ট করেন। আমি বলেছিলাম, লতিফ আওয়ামী লীগে চলে গেছে, তাকে আমি কীভাবে বলবো?’’
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, চেম্বার নির্বাচন এখন আমীর হুমায়ুন ও নুরুল হকের জন্য প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনি লড়াইয়ে দুই নেতার দুই প্যানেল একে অপরকে ঘায়েল করতে মরিয়া। চেম্বার নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টে আইনি লড়াইয়ে দুপক্ষের এ পর্যন্ত প্রায় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। রিটের শুনানিতে দুপক্ষের হয়ে লড়েছেন বাঘা বাঘা আইনজীবীরা। এর মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার ফিদা কামাল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, অ্যাডভোকেট শিশির মনিরসহ আরও অনেকে। এর মধ্যে গত ২০ ও ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের প্রার্থীর পক্ষে লড়াই করা এক আইনজীবীকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে ২০ লাখ টাকা। অন্য আইনজীবীদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ টাকার ওপরে।
আইনি লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন তা দেখার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা। আইনি লড়াইয়ে যে পক্ষ জিতবে নির্বাচনে তারাই বাজিমাত করবে বলে মনে করছেন চেম্বার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, চেম্বার নির্বাচনে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের টিম লিডার সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিরুল হক ঠেকাতে নামের প্রথম ‘টি’ আদ্যক্ষরের চট্টগ্রামের একটি খ্যাতনামা শিল্পগ্রুপের কর্ণধার মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আইনি লড়াইয়ের পেছনে এই শিল্পগ্রুপের কর্ণধার বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছেন। আমিরুল হকের সঙ্গে এই শিল্প গ্রুপের কর্ণধারের দীর্ঘ দিনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর জেরে তিনি চেম্বার নির্বাচনে আমিরুল হকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে জোট বাঁধলো আ.লীগ-বিএনপির দুই ব্যবসায়ী
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে বিএনপি-আ.লীগ ‘সমঝোতা’
