আইনের মারপ্যাঁচে আটকে গেছে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন। এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ স্থগিত করে দিয়েছে। অপরদিকে হাইকোর্টের আদেশ বিবেচনায় নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল (সালিশি আদালত) আগামী ২৮ অক্টোবর টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
তবে হাইকোর্টের আদেশের ফলে এখন চেম্বারের নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ মাইনাস হয়ে গেছে। নির্বাচনে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ নামের প্যানেল থেকে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে প্রার্থী হওয়া ছয় ব্যবসায়ীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেম্বারের পরিচালক হতে যাচ্ছিলেন। ট্রেড গ্রুপ থেকে সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেম্বারের সভাপতির চেয়ারে বসার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু তাদের সামনে এখন বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে হাইকোর্ট ও এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল।
আজ বৃহস্পতিবার এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে চিটাগাং চেম্বারের বিতর্কিত টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে পৃথক তিনটি অভিযোগের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুনানিতে দুপক্ষের আইনজীবী অংশ নেন। তবে গতকাল বুধবার টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের সার্টিফাইড কপি না পাওয়ায় আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল শুনানি মূলতবি করে। আগামী ২৮ অক্টোবর পুনরায় শুনানি হবে। ওইদিন শুনানির পর আদেশ দেবে ট্রাইব্যুনাল।
চিটাগাং চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার ও চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এক্সেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল গত ১৯ জুলাই হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। গতকাল বুধবার (২২ অক্টোবর) এই রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ স্থগিত করে দেয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড প্রধানকে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলো।
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে ২৪টি পরিচালক পদে নির্বাচন হয়। এর মধ্যে অর্ডিনারি থেকে ১২ জন, অ্যাসোসিয়েট থেকে ৬ জন, টাউন অ্যাসোসিয়েশন থেকে ৩ জন এবং ট্রেড গ্রুপ ক্যাটাগরি থেকে ৩ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়।
চিটাগাং চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, ২৪ জন পরিচালকের ভোটাভুটিতে পরিচালনা পর্ষদের প্রেসিডিয়াম নির্বাচন অর্থাৎ সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি নির্বাচিত হয়। এই তিনটা পদে অর্ডিনারি থেকে একজন, অ্যাসোসিয়েট থেকে একজন এবং টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে একজন পরিচালক নির্বাচিত হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ কার্যকর না থাকলে নির্বাচনে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হবে? এ ছাড়া চিটাগাং চেম্বারের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদে ২৪ জন পরিচালক নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নির্বাচনে অংশ না নিলে এই দুই ক্যাটাগারির ৬ জন পরিচালক কীভাবে নির্বাচিত হবে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী সাইফুল আলম চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে সেটা আমাদের বিবেচনার বিষয় না। আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ৪ সেপ্টেম্বরের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এই রিট করেছি। মন্ত্রণালয় গত ২০ আগস্ট টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। এরপর ৩১ আগস্ট রাতে প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধভাবে চেম্বারের সদস্যপদ নবায়ন করে। এরপরও ৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। মন্ত্রণালয়ের এই দ্বৈত অবস্থানের বিষয়টি আমরা রিটে তুলে ধরেছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিটিও) মুহাম্মদ রেহান উদ্দিন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমরা এখনো হাইকোর্টের আদেশের সার্টিফাইড কপি পাইনি। সার্টিফাইড কপি পাওয়ার পর আমরা বাণিজ্য বিধিমালা অনুযায়ী আমাদের করণীয় নির্ধারণ করবো।’
প্রসঙ্গত, ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ। এ নিয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজনীতি সংবাদে ‘চিটাগাং চেম্বারে মেম্বারশিপ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ে চিটাগাং চেম্বার প্রশাসকের। এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন তিনি। তদন্তে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ভুয়া ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের তথ্য উঠে আসে। এ নিয়ে গত ১৫ জুলাই চিটাগাং চেম্বারের তৎকালীন প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। এই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২০ আগস্ট টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। এরপর ২৪ আগস্ট চেম্বারের তৎকালীন প্রশাসক মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোট প্রদানের সুযোগ না দিতে চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড প্রধান মনোয়ারা বেগমকে একটি চিঠি দেন।
কিন্তু গত ৩১ আগস্ট অফিস ছুটির পরে সন্ধ্যায় চিটাগাং চেম্বারের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি সৈয়দ সালাউত উল্লাহ টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করেন। অভিযোগ উঠে, সৈয়দ সালাউত উল্লাহ সুকৌশলে নির্ধারিত অফিস সময়ের পরে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যপদ নবায়ন করেন। যা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে তীব্র সমালোচনা হয়।
এরপরও গত ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চেম্বারের নির্বাচন বোর্ড প্রধানকে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেয়। অথচ এর আগে ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই ‘দ্বৈত অবস্থান’ নিয়ে চট্টগ্রামের সাধারণ ব্যবসায়ীরা তীব্র সমালোচনা করছেন।
চিটাগাং চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার ও চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এক্সেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘‘ভুয়া ও অস্তিত্বহীন টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি লতিফের ‘পকেট ভোট’ ছিল। লতিফের সেই টাউন-ট্রেডের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আমীর হুমায়ুন চৌধুরী নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন। তাহলে লতিফ ও আমীর হুমায়ুনের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?’’
উল্লেখ্য, আগামী ১ নভেম্বর চিটাগাং চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একটি প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছোট ভাই। তার প্যানেলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’। এই প্যানেলের লিডার হলেন সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০০৮ সালের চেম্বার নির্বাচনে লতিফের প্যানেল থেকে বিনা ভোটে পরিচালক হয়েছিলেন।
অপর প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এস এম নুরুল হক। তিনি চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হকের ছোট ভাই। ইতোমধ্যে‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করেছে। তবে এস এম নুরুল হকের প্যানেলের নাম এখনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তারা এখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে প্রচারণাও শুরু করেনি।
আরও পড়ুন:
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে জোট বাঁধলো আ.লীগ-বিএনপির দুই ব্যবসায়ী
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে বিএনপি-আ.লীগ ‘সমঝোতা’
