জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে চলমান সংলাপের মাধ্যমে তৈরি হওয়া জুলাই সনদের খসড়া তালিকা আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কী কী বিষয়ে আপত্তি সেটি তারা কমিশনকে লিখিতভাবে জানাবে।
দলগুলোর দায়িত্বশীলরা বলছেন, কমিশন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া খসড়ায় ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো পরে যুক্ত করে দেওয়া হবে বলা হয়েছে। এখন কেবল খসড়া সনদের ভূমিকা ও উপসংহারের অংশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর ব্যাপারে মতামত আগামীকাল বুধবার লিখিতভাবে কমিশনে জমা দেবেন তারা।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে মধ্যাহ্নভোজ বিরতির সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়নকারী জোনায়েদ সাকি, নির্বাহী সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল, এবি পার্টির প্রধান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বিএলডিপির চেয়ারম্যান ও ১১ দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম।
জুলাই সনদের খসড়াকে অসম্পূর্ণ বলে মনে করে জামায়াতে ইসলামী। একইসঙ্গে নির্বাচিত সরকারকে দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব বিপজ্জনক বলেও মনে করে দলটি।
জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আইনি কাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াত দুটি বিকল্প প্রস্তাব করেছে। তা হলো- অধ্যাদেশের মাধ্যমে কাঠামো তৈরি করে পরে সংসদের অনুমোদন নেওয়া এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া।’
এই জামায়াত নেতা বলেন, আমরা চাই যেকোনো একটি পদ্ধতিতে কাঠামোটিকে আইনগত বৈধতা দেওয়া হোক। সংলাপ কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক না হলে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘অনিশ্চিত’ হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তাহের।
সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহের বলেন, আমরা সংলাপে যেসব বিষয়ে একমত হচ্ছি, সেগুলো বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। সনদ বাস্তবায়নের দুটি পথ থাকতে হবে। ১. অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি আইনি কাঠামো গঠন করে পরে নির্বাচিত সংসদে অনুমোদন। ২. গণভোটের মাধ্যমে জনগণের চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া।
এ জামায়াত নেতা বলেন, যে কোনো একটি পদ্ধতিতে সনদের বৈধতা দিতে চাই। অন্যথায় দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘অনিশ্চয়তার দিকে’ চলে যেতে পারে।
সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহের বলেন, আমরা একমত হয়েছি যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই হতে হবে। প্রায় সবাই একমত, একমাত্র বিএনপি কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে এ জামায়াত নেতা বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি থাকবে। এরা ১২ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর মধ্য থেকে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান নির্বাচন করবেন। একমত না হলে র্যাংক চয়েস ভোটিংয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। ভোটার হবেন মোট সাতজন-উল্লিখিত পাঁচজনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের একজন করে বিচারপতি।
এদিকে এনসিপি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা না করেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘হঠাৎ’ জুলাই সনদের খসড়া প্রকাশ করেছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তা নির্বাচনের আগেই আইনগত ভিত্তি পেতে হবে এবং সেই ভিত্তিতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন হতে হবে।
এই এনসিপি নেতা বলেন, এ দাবিতে প্রয়োজনে লিখিত অবস্থান জানাবে তাদের দল।
জাভেদ রাসিন অভিযোগ করেন, কমিশন ছয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতির কথা বললেও তা নিয়ে আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে জুলাই সনদের খসড়া প্রকাশ করেছে, যা আমরা ‘সঠিক কাজ’ মনে করি না। এভাবে একতরফাভাবে কিছু চাপিয়ে দিলে তা আমরা মানি না।
কেয়ারটেকার সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় ‘র্যাংক চয়েস ভোটিং’ পদ্ধতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এনসিপি।
জাভেদ রাসিন বলেন, আজ বিচার বিভাগ থেকে আরও দুই সদস্য যুক্ত করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব এসেছে যারা ভোট দেবেন। আমরা এই প্রস্তাবে একমত হয়েছি। প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত, কেবল বিএনপি ও কিছু সহযোগী দল ছাড়া।
এই এনসিপি নেতা বলেন, দলটির ফোরামে আলোচনা করেই জুলাই সনদে সই করা হবে কি না সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমাদের স্পষ্ট অবস্থান—আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির পর কমিশনের আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, আগের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় সাবেক বিচারপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাখার বিধান ছিল, যা বর্তমান প্রস্তাবে বাতিল করা হয়েছে। এবার একটি রাজনৈতিক বাছাই কমিটি—প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলের একজন প্রতিনিধি মিলে প্রার্থী বাছাই করবেন।
এই এনসিপি নেতা বলেন, যদি ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব না হয়, তাহলে ‘র্যাংক চয়েস ভোটিং’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান থাকছে। এ প্রক্রিয়ায় উপরের পাঁচজনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন করে বিচারপতি যুক্ত হয়ে মোট সাতজন সদস্য ভোটে অংশ নেবেন। এই বিচারপতিরা নিজ থেকে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবেন না-তারা শুধু ভোট দেবেন।
আখতার হোসেন বলেন, আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এই পদ্ধতি সংসদে সরাসরি পাঠানোর চেয়ে কার্যকর। কারণ সেখানে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হবে।
বিএনপির প্রস্তাব সম্পর্কে এই এনসিপি নেতা বলেন, তারা বলেছে বাছাই কমিটি একমত না হলে বিষয়টি সংসদে পাঠানো যেতে পারে।
আখতার হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি এই ফোরামেই সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তা না হলে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার দিকে যাবে।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে এই এনসিপি নেতা বলেন, এটি এখনো একটি খসড়া এবং দলীয়ভাবে তারা তা পর্যালোচনা করছেন। এই খসড়ায় আমরা মৌলিক সংস্কারের প্রতিটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত দেখতে চাই। যদি তা বাদ দেওয়া হয়, তাহলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—সই করব কি না।
আখতার হোসেন বলেন, আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে তারা ‘লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে, যে সংস্কারগুলো রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে মেনে নিচ্ছে, তা যেন পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসা কোনো দল উপেক্ষা করতে না পারে—এই নিশ্চয়তাও চান তারা।
সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে এই এনসিপি নেতা বলেন, যদি গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান পুনর্লিখন করা যায়, তাহলে সেগুলো সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। আর এই সংস্কারগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন যেন ভবিষ্যতে প্রণীত না হয়-সে নিশ্চয়তার বিধান রাখার প্রস্তাবও দিয়েছি।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদের খসড়া প্রকাশ, রয়েছে ৭ অঙ্গীকার
