, | |

মূলপাতা চট্ট-মেট্টো

চট্টগ্রাম কারাগার থেকে হাজতির পলায়ন: তদন্ত প্রতিবেদন ‘ধামাচাপা’


চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার
প্রকাশের সময় :২৮ জুলাই, ২০২৫ ১:০৫ : অপরাহ্ণ

প্রায় তিন মাস আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এক হাজতি পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে ওই হাজতিকে তার বাড়ি থেকে আটক করে আবার কারাগারে নিয়ে আসা হয়। তখন কারা কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি জানাজানি হলে ঘটনার ১০ দিন পর চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কিন্তু এখন তদন্ত প্রতিবেদনও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামির নাম মো. এমরান (৩২)। হাজতি নম্বর-৮৮৯১/২৫। গত ১ মে ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত বছরের ২ আগস্ট বাকলিয়ার রাহাত্তারপুল এলাকায় একজন শিক্ষার্থী হত্যাচেষ্টার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বাকলিয়া থানার সেকান্দর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকার মৃত আব্দুস ছামাদের ছেলে।

জানা যায়, গত ১ মে বিকেলে এমরান চট্টগ্রাম কারাগারের নিচতলায় জেলারের কার্যালয়ের পাশে থাকা শৌচাগারের জানালা ভেঙে বেরিয়ে পড়েন। পরে পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে নিচে নেমে বাইরে চলে আসেন। এরপর কারাগারের মূল ফটক দিয়ে কারারক্ষীদের সামনে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যান তিনি।

সেদিন সন্ধ্যায় ওয়ার্ডে একজন হাজতি কম থাকায় খোঁজ শুরু হয়। কারাগারের ভেতরে তাকে না পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রাখে। অ্যালার্মও বাজানো হয়নি। রাত ১০টার দিকে কারা কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, এমরান বাড়িতে ফিরে গেছেন।

জানা গেছে, পরদিন চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষ বাকলিয়া থানা পুলিশের সহায়তা নিয়ে হাজতি এমরানকে বাড়ি থেকে আটক করে পুনরায় কারাগারে নিয়ে আসে।

১০ দিন এ ঘটনা ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার চেষ্টা করে কারা কর্তৃপক্ষ। ঘটনার ১০ দিন পর ১০ মে চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) টিপু সুলতান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

কমিটির প্রধান হলেন-কক্সবাজারের জেল সুপার জাবেদ মেহেদী। আর দুই সদস্য হলেন-বান্দরবানের জেলার নাশির আহমেদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডেপুটি জেলার মো. বিলাল উদ্দীন।

চট্টগ্রাম কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্তু কমিটি কিছু দিন আগে চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

জানা গেছে, তদন্ত শেষ হলেও এখনো পর্যন্ত এ ঘটনার জন্য দায়ী কারও বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান কক্সবাজারের জেল সুপার জাবেদ মেহেদী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ছিল ঘটনার তদন্ত করা। আমরা এটা তদন্ত শেষ করে ডিআইজির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।’

কিন্তু চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) টিপু সুলতান তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

রাজনীতি সংবাদকে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি তো আমার কাছে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। আপনাকে যিনি বলেছেন তিনি ভুল বলেছেন, তার কাছে আমি এটার ব্যাখ্যা চাইবো। তিনি এটা কীভাবে বললেন।’

তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে হাজতি পালানোর ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কথা উঠে এসেছে।

জেল কোডের ৪৭৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী, ওয়ার্ড থেকে কোনো বন্দী নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে এলার্ম (পাগলা ঘণ্টা) বাজাতে হবে। বন্দী পালিয়ে গেলে কারাগারের জেলার সাথে সাথে নিকটস্থ থানা, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারকে অবহিত করবেন। কিন্তু গত ১ মে হাজতি এমরান পালানোর ঘটনায় জেলার মোহাম্মদ মাসুদ হাসান জুয়েল এসবের কিছুই করেননি। বরং তিনি ১০ দিন এ ঘটনা ধাপাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, বাকলিয়া থানা পুলিশ পলাতক বন্দীকে আটকের পর আদালতে চালান না দিয়ে কোন আইনে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে? আর কারা কর্তৃপক্ষও কোন প্রক্রিয়ায় পলাতক হাজতিকে পুলিশের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে?

জানতে চাইলে বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন রাজনীতি সংবাদের কাছে দাবি করেন, কারাগার থেকে পলাতক হাজতি এমরানকে বাকলিয়া থানা পুলিশ আটক করেনি। আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না।

অথচ পলাতক হাজতি এমরানের ভাই মো. ইরফান একটা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ও (এমরান) কারাগার থেকে পালিয়ে বাড়িতে চলে আসে। এটা এলাকায় জানাজানি হলে বাকলিয়া থানা পুলিশ ও কারাগারের লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে যান।

অভিযোগ উঠেছে, জেলার মাসুদ হাসান জুয়েল বাকলিয়া থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিনের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে পলাতক হাজতিকে আটক করে কারাগারে নিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার মাসুদ হাসান জুয়েল রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘হাজতি এমরান ওই দিন শৌচাগারের জানালা ভেঙে বেরিয়ে পড়েন। পরে পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে নিচে নেমে কারাগারের মূল ফটক দিয়ে পালিয়ে যান। পরে কারারক্ষীরা গিয়ে পথিমধ্যে তাকে পাকড়াও করে নিয়ে আসেন।’

বাকলিয়া থানা পুলিশ হাজতি এমরানকে বাড়ি থেকে আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার বলেন, ‘এটা তো আমাকে বললে হবে না।’

বাকলিয়া থানার ওসির সঙ্গে মধ্যস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই।’

২০২১ সালের ৬ মার্চ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান ফরহাদ হোসেন নামের এক হাজতি। পরে নরসিংদী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন জেলার ও ডেপুটি জেলারকে প্রত্যাহার করা হয়।

কারাগার থেকে হাজতি পালানোর ঘটনায় মামলা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) টিপু সুলতান বলেন, ‘এটা কারাগারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি তদন্ত প্রতিবেদন দেখে ব্যবস্থা নেবো।’

আরও পড়ুন: 

চিটাগাং চেম্বারে মেম্বারশিপ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি

মাসে দেড় কোটি টাকা আয় করে কর দেয় না চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর