চার দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে জাপানের টোকিওতে অবস্থান করছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে আজ বৃহস্পতিবার জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একটি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।
প্রশ্নটি ছিল-সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ড. ইউনূসের পদত্যাগ গুঞ্জন নিয়ে। তিনি পদত্যাগ করতে পারেন এমন আলোচনায় বাংলাদেশ ও এর বাইরে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয় সম্প্রতি। পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম গত সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জানান, প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন। তার কাছে ড. ইউনূস কী এমন বার্তা দিয়েছিলেন?
নিক্কেই এশিয়ার এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশে এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিইনি। যেহেতু বাংলাদেশে উত্তর দিইনি, তাই যদি জাপানে এসে উত্তর দিই তাতে আমার জন্য অনেক বেশি ঝামেলা তৈরি হবে।’
‘নিক্কেই ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনের ফাঁকে ওই সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে ড.ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিক পরিমাণ সুতা, তেল ও গ্যাস কেনার প্রস্তাবের কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ওপর শতকরা ৩৭ ভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। সেখান থেকে সুতা, তেল ও গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন ড. ইউনূস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার প্রস্তাবও ব্যবহার করবেন বলে জানান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেহেতু প্রতিটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চান, সে প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকে এসব পণ্য আমদানির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা অনেক তুলা সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে কিনি, আবার ভারত থেকেও। এখন ভাবছি, যদি আমরা এগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনি, এতে আমাদের মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমে যাবে।’
গত অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৬.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং আমদানি করেছে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এর মধ্যে ৩৬১ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি ছিল।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৭.৯ বিলিয়ন ডলারের কাঁচা তুলা প্রয়োজন হয়, যার বেশির ভাগই আসে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলো থেকে। ২০২৪ সালের আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তুলা বাংলাদেশের মোট আমদানির ১২.৫ শতাংশ ছিল।
ড. ইউনূস বলেন, ‘আমেরিকার তুলা উৎপাদকরা আমাদের খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে’ এবং তারা ‘প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের কিছু রাজনৈতিক সংযোগ’ তৈরিতে সহায়তা করছে।’
মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ জ্বালানি হিসেবে চাহিদার বেশিরভাগ তেল আমদানি করে। কিন্তু ড. ইউনূস বলেছেন, এই পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও কেনা যেতে পারে।
যদিও বাণিজ্য আলোচনার সময়সূচি বা শুল্ক কতটা কমবে তা এখনো নিশ্চিত নয়, তবুও ড. ইউনূস জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা একে হুমকি হিসেবে দেখি না, বরং সুযোগ হিসেবে দেখি।’
এদিকে, মার্কিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত বুধবার ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আদালত রায় দিয়েছেন, সংবিধান অনুসারে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
দেশীয় অর্থনীতি প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, ‘আগের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে থাকা আরো ১১-১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করা হয়েছে।’
এই অর্থের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দুটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করছে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হবে। এ ছাড়া এটি দরিদ্র জনগণের জীবন বদলাতে এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হবে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদের সাক্ষাৎ, কী কথা হলো?
