শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৩ | ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ | ১৭ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৫

মূলপাতা সাক্ষাৎকার

এহেছানুল হায়দর বাবুলের সাক্ষাৎকার

উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আর নির্বাচন করবো না


প্রকাশের সময় :২৭ জুন, ২০২২ ৪:২১ : অপরাহ্ণ
এ কে এম এহেছানুল হায়দর বাবুল

চট্টগ্রামের রাউজানের তিনবারের উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম এহেছানুল হায়দর বাবুল। বয়স ৬৮ বছর। তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বেও আছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত মানুষ। রাউজানের উপজেলা চেয়ারম্যান হলেও তিনি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত মুখ। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বেশ সরব থাকেন তিনি।

এহেছানুল হায়দর বাবুল ১৯৮৪ সালে প্রথমবারের মতো রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদে মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি রাউজান উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রথমবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দুটি উপজেলা নির্বাচনেও তিনি চেয়ারম্যান পদে জয়ী হন।

রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, নির্বাচনের স্মৃতি ও রাউজানের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গেলো বুধবার এহেছানুল হায়দর বাবুল কথা বলেছেন রাজনীতি সংবাদের সঙ্গে।

প্রশ্ন: আপনি রাজনীতির সঙ্গে কখন সম্পৃক্ত হন?

উত্তর: ১৯৬৮ সালে রাউজান ডাবুয়া তারাচরণ শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে অস্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় আমি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। পরে রাউজান আর আর এ সি হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ১৯৭০ সালে নগরীর আগ্রাবাদ কমার্স কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হই। ওই সময় কমার্স কলেজ দিশারী ছাত্রসংসদের নির্বাচনে সহ-সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাকে ওই পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৭১ সালে যুদ্ধের পরে আমাকে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রশ্ন: ১৯৭০ সালে আপনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তখন মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার কী ভূমিকা ছিল?

উত্তর: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি বাড়িতে ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমি সংগঠক পাইনি। তাই যুদ্ধে অংশ নিতে পারিনি। তবে যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর ১২৮ জন সদস্যকে আমাদের খামার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম।

প্রশ্ন: ২০০৯ সালে রাউজানে উপজেলা নির্বাচনে আপনার তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলো। সেই নির্বাচনে প্রথমবার জিতে আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিল?

উত্তর: ২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে ৮৩টি ভোটকেন্দ্রে আমি জয়ী হয়েছিলাম। আমার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন-তৎকালীন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুসলিম উদ্দিন খান এবং মেজর (অব.) জামশেদ উদ্দিন। নির্বাচনে তিন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এ কারণে আমি ওইদিন বাসা থেকে বের হইনি। কারণ বাসা থেকে বের হলে যদি তাদের সঙ্গে দেখা হয় তাহলে তারা মনে কষ্ট পেতেন।

প্রশ্ন: আপনি কি রাউজানে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন?

উত্তর: উপজেলা চেয়ারম্যানের তো কার্যত কোনো ক্ষমতা নেই। উন্নয়ন তহবিল আর রেভিনিউ তহবিলের মধ্যে কাজ সীমাবদ্ধ। এর বাইরে আমি যদি রাস্তা-ঘাটের কাজ করি এমপি সাহেব কি নিষেধ করবেন? এলাকার কোনো গরীব মানুষকে সাহায্য করলে এমপি সাহেব কি বাধা দিবেন?

প্রশ্ন: স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিরোধের কারণে রাউজানের সাবেক পৌরসভা মেয়র দেবাশীষ পালিত ৫ বছর ধরে কোনো কাজ করতে পারেননি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তখন অভিযোগ করেছিলেন। সেক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণেই কি আপনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন?

উত্তর: দেবাশীষ বলেছেন, তাকে নাকি এমপি সাহেব এলাকায় ঢুকতে দেননি। সে যদি এলাকায় যেতে না পারে তাহলে বাড়িতে গিয়ে কীভাবে পূজা করলো? ওর পূজামণ্ডপে এমপি সাহেব ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ঢাকার পূর্বাচলে তাকে ৩ কাঠা প্লট দিয়েছেন এমপি সাহেব। তার নির্বাচনের সময় এমপি সাহেব আমার মাধ্যমে তাকে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ওর বড় ভাইকেও চট্টগ্রামের ন্যাশনাল হাউজিংয়ে প্লট দিয়েছেন।

প্রশ্ন: উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নানা কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু রাউজানে দীর্ঘদিন ধরে আপনার সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বেশ সখ্যতা রয়েছে। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এই সম্পর্ক কীভাবে অটুট রাখলেন?

উত্তর: উনার (ফজলে করিম চৌধুরী) তিনটা গুণ আছে। এক. সময়ের প্রতি তিনি খুবই সিরিয়াস। দুই. তিনি কথা দিয়ে কথা রাখেন। তিন. দলের কর্মীদের প্রতি তিনি খুবই আন্তরিক। আমি যখন ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরি, তিনি আমাকে রিসিভ করতে বিমানবন্দরে ছুটে যান। এই তিনটি গুণের কারণে তার সঙ্গে শুধু আমার নয়, রাউজানে সকল নেতা-কর্মীর সম্পর্ক অটুট আছে।

প্রশ্ন: আপনি এ পর্যন্ত তিনবার রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সামনে কি সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে?

উত্তর: উনি (ফজলে করিম চৌধুরী) হলেন রাউজানে নৌকার মাঝি। আমি যদি উনার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করি তাহলে নৌকার যাত্রীরা সবাই ডুবে যাবে। রাউজানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য উনাকে প্রয়োজন।

প্রশ্ন: তাহলে আপনি কি আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন?

উত্তর: না, আমি আর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবো না। সামনে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হবো।

প্রশ্ন: চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ নির্বাচনে কেন প্রার্থী হতে চান?

উত্তর: জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হলে সরাসরি কাজ করার সুযোগ আছে। ১৫টি উপজেলায় বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করার সুযোগ পাবো।

উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আর নির্বাচন করবো না

প্রশ্ন: আাপনাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে দগ্ধ মানুষদের হুইল চেয়ার ঠেলতে দেখা গেছে। এরকম একটা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের নজর কেড়েছে। একজন উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েও সেদিন কেন আপনি একজন স্বেচ্ছাসেবকের মতো ভূমিকা পালন করেছিলেন?

উত্তর: রাজনীতির অপর নাম হলো জনসেবা। আর কীভাবে জনগণের সেবা করতে হয় সেটা দেখিয়েছেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী (চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি)। ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর ডায়রিয়া ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে তিনি মুসলিম হলকে হাসপাতাল বানিয়ে একজন স্বেচ্ছাসেবকের মতো রোগীদের সেবা দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে স্যালাইনের সংকট দেখা দিলে তিনি সিভিল সার্জনের অফিসের তালা ভেঙ্গে রোগীদের জন্য স্যালাইন নিয়ে আসেন। পরে নিজে স্যালাইনও তৈরি করেছিলেন। আমি তখন তার সঙ্গে ছিলাম। তার কাছ থেকেই আমি মানুষের সেবা করতে শিখেছি। সেদিন রাতে সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধদের চট্টগ্রাম মেডিকেলে আনার জন্য আমি ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করি। হাসপাতালে সারা রাত জেগে থেকে অগ্নিদগ্ধ মানুষদের সেবা করেছি। অগ্নিদগ্ধ মানুষদের রক্ত দিতে ও তাদের পাশে দাঁড়াতে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক লোকজন ছুটে আসে। রাতভর হাসপাতালে সেবা দেওয়া ১৭০ জন স্বেচ্ছাসেবককে আমি সকালে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে নাস্তা করাই।

প্রশ্ন: রাজনৈতিক জীবনে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি আছে?

উত্তর: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৭ সালে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন ভারতে আত্মগোপন করে ছিলেন, তখন সেখান থেকে তিনি আমার মাধ্যমে লালখান বাজারে তার বাসায় চিঠি পাঠাতেন। একদিন মহিউদ্দিন চৌধুরীর লালখান বাজারের বাসা থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আমাকে আটক করেন। ক্যান্টনমেন্টে আমাকে ১৫ দিন আটকে রাখেন। এরপর আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। সাড়ে ৫ মাস জেল কেটেছি। এরপর ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আবার গ্রেপ্তার হই। তখন দেড় মাস জেল কেটেছি।

মন্তব্য করুন


আরও খবর