বুধবার, ১০ আগস্ট, ২০২২ | ২৬ শ্রাবণ, ১৪২৯ | ১১ মহর্‌রম, ১৪৪৪

মূলপাতা সাক্ষাৎকার

এটিএম পেয়ারুল ইসলামের সাক্ষাৎকার

ফটিকছড়িতে নজিবুল বশরের মতো এমপি থাকলে আওয়ামী লীগে গ্রুপিং থাকবে


প্রকাশের সময় :৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ৫:৪০ : অপরাহ্ণ

এটিএম পেয়ারুল ইসলাম। বয়স ৬১ বছর। আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সহসভাপতি। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আলোচিত এ আওয়ামী লীগ নেতা ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন। ১৯৮১-৮২ সালে তিনি উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৯-৯০ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। ১৯৯০ সালে ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৩-৯৪ সালে ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন তিনি। গত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও ভোটের আগে সরে দাঁড়ান।

ফকিছড়িতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সাংগঠনিক নানা বিষয় নিয়ে এটিএম পেয়ারুল ইসলাম কথা বলেছেন রাজনীতি সংবাদ এর সাথে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি সংবাদ এর সম্পাদক সালাহ উদ্দিন সায়েম

প্রশ্ন: ফটিকছড়িতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

উত্তর: নির্বাচনে সাতটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ, তিনটিতে বিদ্রোহী ও দুটি ইউনিয়নে জামায়াতের চেয়ারম্যান প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

প্রশ্ন: জামায়াতের চেয়ারম্যান প্রার্থী কীভাবে জয়ী হলেন?

উত্তর: যারা জামায়াত থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তারা এমপি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর লোক হিসেবে খ্যাত। হারুয়ালছড়িতে ইকবাল হোসাইন চৌধুরী ও পাইন্দংয়ে নির্বাচিত হওয়া ছরওয়ার হোসেন স্বপন জামায়াতের প্রার্থী। এছাড়া আরও দুটি ইউনিয়নে এমপি সাহেবের সমর্থিত জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। তারা হলেন-সুন্দরপুরে মোল্লা আজম ও কাঞ্চননগরে রশিদ উদ্দিন চৌধুরী কাতেব। কিন্তু তারা জিততে পারেননি। চার ইউনিয়নের এসব চেয়ারম্যান প্রার্থীরা এমপি সাহেবের ছত্রছায়ায় ছিলেন।

প্রশ্ন: তাহলে কি নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য নিরপেক্ষ ছিলেন না?

উত্তর: নির্বাচনে তিনি (এমপি) পক্ষপাতিত্ব করেছেন। কথা উঠেছে, প্রায় ইউনিয়নের প্রার্থীর সাথে এমপি সাহেবের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। কারো কাছ থেকে ৩৫ লাখ, কারো কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন তিনি। যারা টাকা দিয়েছেন তারা এমপি সাহেবের ওপর ক্ষুব্ধ। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মর্মাহত হয়েছেন।

প্রশ্ন: এসব আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে কি কোনো প্রার্থী উপজেলা বা জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে অভিযোগ করেছেন?

উত্তর: কেউ অভিযোগ করেননি। এটা শুনা গেছে। কিন্তু লেনদেন যে হয়েছে সেটা ঠিক। বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি, এসপির নাম ভাঙ্গিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। ডিসি, এসপি প্রশাসনের নামে টাকা নেওয়াটা গুরুতর অনৈতিক কাজ হয়েছে। নির্বাচনের সময় সমন্বয় কমিটির সভায় ডিসি, এসপি বলেছেন, ‘আমাদের নামে টাকা নেওয়ার কথা শুনা যাচ্ছে। এগুলো অকার্যকর।’ ডিসি ও এসপি সৎ মানুষ। তারা কোনো প্রার্থীর থেকে টাকা নিয়েছেন বলে আমি শুনিনি। তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি (এমপি) একজন পীর বংশের লোক। এ ধরণের কর্মকাণ্ড থেকে তার দূরে থাকা উচিত।

প্রশ্ন: তরিকতপন্থী সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সাথে কি জামায়াতের সম্পৃক্ততা আছে?

উত্তর: তিনি উপরে বলে জামায়াতবিরোধী। কিন্তু তিনি ফটিকছড়িতে জামায়াতকে তার পক্ষে শক্তভাবে সুসংগঠিত করে ফেলেছেন।

প্রশ্ন: গত সংসদ নির্বাচনে তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাথেই তো তার সখ্যতা থাকার কথা…

উত্তর: তিনি (নজিবুল বশর) এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। তখন টেলিভিশনে এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের হাতে ইসলাম নিরাপদ নয়, দেশের মানুষ নিরাপদ নয়।’ ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। কারণ তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব হলো বায়বীয়। গত সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পাওয়ার কারণে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ তিনি আওয়ামী লীগকে সম্মান ও মর্যাদা দেন না। বিএনপি-জামায়াতের সাথেই তার সখ্যতা।

প্রশ্ন: স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে সংসদ সদস্যের (নজিবুল বশর) দূরত্বের কারণ কী?

উত্তর: ফটিকছড়ির পার্শ্বর্তী হাটহাজারীতে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আওয়ামী লীগের সাথে সমন্বয় করে কাজ করেন। কিন্তু ফটিকছড়িতে তিনি (নজিবুল বশর) আওয়ামী লীগের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। উপজেলা-জেলা আওয়ামী লীগের সাথে তার কোনো সমন্বয় নেই।

প্রশ্ন: ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন ধরে কোন্দল চলে আসছে। এর কারণ কী?

উত্তর: যেখানে নজিবুল বশরের মতো এমপি থাকবে, সেখানে আওয়ামী লীগে গ্রুপিং থাকবে।

প্রশ্ন: তিনি (নজিবুল বশর) তো আলাদা একটা রাজনৈতিক দল করেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি করে তার কী লাভ?

উত্তর: তিনি ফায়দা লুটার জন্য ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করে রাখেন। আওয়ামী লীগে গ্রুপিং থাকলে নির্বাচনে মনোনয়ন নিতে তার (এমপি) সুবিধা হয়।

প্রশ্ন: তাহলে কি দলীয় প্রার্থী না থাকাতে ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

উত্তর: ফটিকছড়িত আওয়ামী লীগের একটা ঐতিহ্য আছে। সেই ঐতিহ্য এখন ভেঙ্গে চুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। তিনি (নজিবুল বশর) উপজেলা আওয়ামী লীগকে দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছেন। একপক্ষকে তিনি শেল্টার দিয়ে আসছেন।

প্রশ্ন: আগামী সংসদ নির্বাচনে ফটিকছড়িতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কি কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার দাবি জানাবে?

উত্তর: দাবি জানানো হবে কি না সেটা আমি জানি না। তবে বিষয়টা হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আছে।

প্রশ্ন: গত সংসদ নির্বাচনে আপনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের আগে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। আগামী নির্বাচনে কি আবারও মনোনয়ন চাইবেন?

উত্তর: অবশ্যই মনোনয়ন চাইবো। দলীয় সভানেত্রী চাইলে প্রার্থী হবো।

প্রশ্ন: দলের সাথে দূরত্ব থাকলেও এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে সংসদ সদস্যের সম্পর্ক কেমন?

উত্তর: তিনি (সংসদ সদস্য) তো এলাকায় আসেন না। মাইজভান্ডারীর ওরস ও উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভা হলে এলাকায় আসেন। আর তিনি এলাকায় আসলে পুলিশ পাহারায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘এটা প্রটোকল’ আর সাধারণ মানুষ মনে করেন যে, ‘তিনি (এমপি) জনগণকে ভয় পান’। তার গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান থাকতে হবে। একটি পিকআপ ভ্যানে ১০ জন পুলিশ সদস্য থাকেন। তিনি যতক্ষণ বাড়িতে অবস্থান করেন ততক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় থাকেন। সমন্বয় কমিটির সভার সময়ও তিনি পুলিশ পাহারায় থাকেন। মন্ত্রীরাও তো এরকম প্রটোকল নেয় না।

প্রশ্ন: ফটিকছড়ির উন্নয়নে সংসদ সদস্য কতটুকু ভূমিকা রাখছেন?

উত্তর: রাউজান ও মিরসরাইয়ের সাথে তুলনা করলে ফটিকছড়ি শূন্যের কোটায়। বয়স্কভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ভিজিটি কার্ড ও সরকারের গতানুগতিক কিছু কাজ হচ্ছে আমলাদের মাধ্যমে।

প্রশ্ন: ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি কি আছে?

উত্তর: ১৯৮৬ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সন্দ্বীপের উড়িরচর এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করতে এসেছিলেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন উড়িরচরে দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেদিন আমরা একসঙ্গে ডিঙ্গি নৌকায় করে ফেরার পথে ডুবে যেতাম। নৌকাটি একবার ১০ হাত পানির ওপরে উঠে, আবার ১০ হাত নিচে নামে। সাড়ে তিন ঘণ্টা নৌকা চালিয়েও সাড়ে তিন ফুট যেতে পারিনি আমরা। এক জায়গায় অবস্থান করছিলাম। ঢেউয়ের জন্য নৌবাহিনীও আসতে পারেনি। যখন আবহাওয়া স্বাভাবিক হয় তখন আমরা রওনা হই। সেদিন নেত্রীকে কাছ থেকে দেখেছি, তিনি অনেক সাহসী ও ধৈর্য্যশীল।

রাজনীতি সংবাদ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এটিএম পেয়ারুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন:

ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন করে চাঙ্গা, নেপথ্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন!

নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীকে ঠেকাতে বাদল ও মোছলেমকে টাকা দিয়েছিলেন মোরশেদ খান

গণভবনে কেউ ঢুকতে পারেনি বিধায় প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছি


Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

আরও খবর