, | |

মূলপাতা আন্তর্জাতিক

শান্তিতে নোবেলের জন্য ট্রাম্পসহ আলোচনায় যারা


এবার শান্তিতে নোবেলের জন্য আলোচনায় আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতি সংবাদ ডেস্ক প্রকাশের সময় :৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:০৭ : অপরাহ্ণ

নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘিরে জল্পনা এখন তুঙ্গে। আগামী শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে ঘোষণা করা হবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ীর নাম। বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত, মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের মধ্যে এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটি কার হাতে উঠবে-তা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই।

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি সংগঠন রয়েছে। তবে কারা মনোনয়ন পেয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয় না।

নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়নসংক্রান্ত তথ্য ৫০ বছর গোপন রাখা হয়। ফলে বিভিন্ন দেশ বা মনোনয়নদাতা নিজেরা নাম প্রকাশ করলে তবেই কোনো প্রার্থীর নাম প্রকাশ্যে আসে।

তবে বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমে আলোচনায় আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে পোপ লিও, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত এবং যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে কাজ করা মানবিক সংগঠনগুলো।

আলোচনার কেন্দ্রে ট্রাম্প
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি নিঃসন্দেহ নাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্পকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তবে নোবেল কমিটি এসব দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। কারণ মনোনয়ন গোপন রাখার নিয়ম রয়েছে।

ট্রাম্প নিজেও বহুবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। গত বছরও পুরস্কার পাওয়ার জন্য তার ব্যাপক প্রচার ও লবিং আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় ছিল।

শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের পুরস্কার পান ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। পরে মাচাদো তার নোবেল পদক ট্রাম্পকে উপহার দেন-যা পুরস্কারটির ইতিহাসে নজিরবিহীন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধসহ তার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির কারণে তাকে পুরস্কৃত করা হলে তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআইও) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন জেরলোর মতে, এ বছর পাঁচ সদস্যের কমিটি এমন একজনকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকবে যিনি ট্রাম্পের চাপ সামলাতে পারবেন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি মনে করি, গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা, এবং পরবর্তীতে মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ট্রাম্পকে পুরস্কার প্রদান, তাদের কিছু বিবেচনার ওপর প্রভাব ফেলবে’।

পোপ লিও
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় উঠে এসেছে রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিওর নাম। তিনি প্রথম মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ এবং যুদ্ধ বন্ধ, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত সমাধানের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান, অভিবাসীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে পোপের ভূমিকা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এনেছে। এমনকি ট্রাম্পের নীতির সমালোচনাও করেছেন পোপ লিও।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনেও পোপ লিওকে সম্ভাব্য শান্তি পুরস্কারপ্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন এএফপিকে বলেছেন, পুরস্কার নিয়ে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরনের প্রচার ও চাপ থাকে এবং কমিটি এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত।

মার্ক কার্নি
আলোচনায় রয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক চাপের বিরুদ্ধে কানাডার অবস্থান তুলে ধরার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্নির ভূমিকা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

তবে তাকে পুরস্কার দেওয়া হলে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন। এ কারণে তার নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় থাকলেও ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক আদালত
এবারের আলোচনায় ব্যক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে)-এর নাম।

আন্তর্জাতিক আইন ও যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তাদের আলোচনায় এনেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সংঘাত ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রেও রয়েছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন।

গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর নিয়ে আলবানিজের অবস্থান তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করলেও একই কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।

সুদানের স্বেচ্ছাসেবীরা
এবারের আলোচনায় বড় জায়গা দখল করেছে সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস (ইআরআর)। এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যারা সংঘাতের মধ্যে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে।

এএফপি জানিয়েছে, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের দ্বৈত সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে এই স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন। যুদ্ধের ময়দানে সাধারণ মানুষের মানবিক সহায়তার এমন উদ্যোগ নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় ইআরআর-কে সামনে এনেছে।

শিশুদের অধিকার ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া সংস্থা
ইউক্রেনে যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা মাইকোলা কুলেবা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন সেভ দ্য চিলড্রেন-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় শিশুদের ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় কুলেবার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

এছাড়া সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর ভয়াবহ ঝুঁকি ও প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটির কাজ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
এবারের সম্ভাব্য তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নামগুলোর একটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও মহাকাশে যৌথভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে আইএসএস দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউরোপসহ বিভিন্ন পক্ষের যৌথ অংশগ্রহণে পরিচালিত এই প্রকল্পকে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান বিভাজনের বিপরীতে সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে ব্যক্তির পরিবর্তে একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রকল্পকে পুরস্কৃত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।

কোন পথে যাবে নোবেল কমিটি?
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেন বলেছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন চলছে, যা কমিটির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠান, উদ্যোগ ও সহযোগিতার পদ্ধতি যারা তৈরি করছে এবং আলফ্রেড নোবেলের শান্তির ধারণার সঙ্গে যাদের কাজ সামঞ্জস্যপূর্ণ—তাদের দিকে কমিটির নজর থাকবে।

তার মতে, এবারের শান্তি পুরস্কারের প্রেক্ষাপটও তাই অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল। ইউক্রেন, সুদান, ইরান, ইয়েমেন ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

Rajniti Sangbad


আরও খবর