চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন নিয়ে নানা নাটকীয়তা চলছে। নির্বাচন থেকে চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিতে চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার মোহাম্মদ বেলাল গত ১৯ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। এরপর ২২ অক্টোবর রিটের শুনানি শেষে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ ছাড়া নির্বাচন করার আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর গত ৩০ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্বাচন স্থগিত করার আদেশ দেয়। গত ১ নভেম্বর চিটাগাং চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার মোহাম্মদ বেলাল হাইকোর্টে যাওয়ার আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে (সালিশি আদালত) অভিযোগ দাখিল করেছিলেন। আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে হাইকোর্টে কেন রিট করা হলো-গত ২৯ অক্টোবর চেম্বার জজ আদালতের শুনানিতে বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা এমন প্রশ্ন তুললে মোহাম্মদ বেলাল আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল থেকে ওইদিনই অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু মোহাম্মদ বেলাল এখন আবার আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে গত ১৬ নভেম্বর আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিটাগাং চেম্বারের অর্ডিনারি মেম্বার ও চট্টগ্রাম গার্মেন্টস এক্সেসরিজ গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজনীতি সংবাদের কাছে হাইকোর্টে আবেদন করার বিষয়টি প্রথমে সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নয়। আমার আইনজীবী কেন এই আবেদন করেছেন তার সঙ্গে কথা বলে কিছুক্ষণ পর আপনাকে জানাচ্ছি।
এরপর রাজনীতি সংবাদের এই প্রতিবেদক মোহাম্মদ বেলালের পক্ষে হাইকোর্টে আবেদন করা আইনজীবী সাইফুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ বেলাল রাজনীতি সংবাদের এই প্রতিবেদককে ফোন করে আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে আবেদন করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘নিয়ম মেনে হাইকোর্টে এই আবেদন করা হয়েছে। আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল থেকে আমার অভিযোগ প্রত্যাহার করা হলেও সেখানে আরও চারজনের অভিযোগ রয়ে গেছে। তাদের অভিযোগের বিষয়ে হাইকোর্ট রায় না দেওয়া পর্যন্ত আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। তাই আমরা আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছি।’
মোহাম্মদ বেলালের ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’ নামে একটি প্যানেল থেকে পরিচালক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এস এম নুরুল হক। তিনি চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হকের ছোট ভাই।
‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’ নামের এই প্যানেলটি ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ নামে আরেকটি প্যানেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রামের অন্যতম শিল্পগ্রুপ সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক।
মোহাম্মদ বেলালের আর্বিট্রেশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টে আবেদন করার বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’ প্যানেল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তাদের যদি দুর্বলতা না থাকে তাহলে নিজেদের গুটিয়ে নেবে কেনো?’
জানা গেছে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৯ নভেম্বর) হাইকোর্টে এই রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানি শেষে রিটের বিষয়ে আদেশ দেবে হাইকোর্ট।
এদিকে হাইকোর্টে মোহাম্মদ বেলালের রিটের অভিযোগ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিটাগাং চেম্বারের বিতর্কিত টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তিনি এই রিট দায়ের করেছেন। গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু ১৪ দিন পর গত ৪ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেয়।
ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, মোহাম্মদ বেলাল অর্ডিনারি মেম্বার। তিনি টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্য নয়। এ ছাড়া তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করছেন না। এরপরও কেন তিনি টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলেন?
চিটাগাং চেম্বারের আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার এখতিয়ার নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। কেবল চেম্বার বোর্ডের এই এখতিয়ার আছে। ফলে গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করার নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিটিও) চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর নির্দেশ দেওয়ার পর তার কাছে ‘এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ’ করার বিষয়ে ‘কৈফিয়ত’ চান বাণিজ্য উপদেষ্টা ও বাণিজ্য সচিব। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিটিও চিটাগাং চেম্বারের টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেয়।
আরও পড়ুন: চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন স্থগিত
