মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কার মধ্যে পারমাণবিক হামলার ভয়াবহতার মুখে দাঁড়িয়েছে ইরান। সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলা থেকে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষা করার উপায় ও করণীয় সম্পর্কে সতর্ক করে একটি বিশেষ শিক্ষামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছে ইরান সরকার। এই ভিডিও প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে পারমাণবিক শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ আট মিনিটের একটি শিক্ষামূলক ভিডিও এবং এ সংক্রান্ত বিস্তারিত পরামর্শ প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনৈতিক উপস্থাপক টাকার কার্লসনের বার্তা এবং গত ১৬ অক্টোবর খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারির পর থেকেই এই শঙ্কা চরম রূপ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসী এবারই প্রথম এত গভীরভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক হুমকির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় এড়াতে এবং হামলা চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে সাধারণ নাগরিকেরা কীভাবে নিজেদের রক্ষা করবেন, তা ভিডিওটিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
ভিডিওতে আশ্রয় নেওয়া, তেজস্ক্রিয় দূষণ এড়ানো ও তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বা ফলআউট থেকে সুরক্ষার উপায় তুলে ধরা হয়েছে। নাগরিকদের ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা বেসমেন্টে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জানালা থেকে দূরে থাকতে এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বাইরের বাতাস ঘরের ভেতরে প্রবেশ করায়, এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেউ খোলা জায়গায় আটকা পড়লে তার করণীয় কী, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওতে। প্রাথমিক বিস্ফোরণের ধাক্কা কেটে গেলে বাসিন্দাদের নিকটতম মজবুত ভবনে প্রবেশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মিশর ও সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমগুলোও এ নির্দেশনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হামলার পর অন্তত ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে। এ সময় প্যাকেটজাত খাবার ও বোতলজাত পানি ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। যানবাহনের ভেতরে আশ্রয় নিতে নিষেধ করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার মিশরীয় সংবাদমাধ্যম ভেটো জানিয়েছে, নির্দেশাবলীতে ২৪ ঘণ্টা আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে থাকার প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
রিয়াদ-ভিত্তিক সৌদি নিউজ ৫০ আরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে যে, ওই ২৪ ঘণ্টা পর তাদের চারপাশ নিরাপদ থাকবে বলে যেন তারা ধরে না নেয়।
সৌদি নিউজ ৫০-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ভবনে আগুন লাগলে বা সেটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকলে অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে।
মিশরীয় সংবাদমাধ্যম সাদা এল বালাদ জানিয়েছে যে, লোকজনকে বিস্ফোরণ দেখা বা তার ছবি তোলার জন্য বাইরে থাকতে এবং যানবাহন আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরানের জরুরি সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, তেজস্ক্রিয় কণা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে বিস্ফোরণস্থল থেকে অনেক দূরে থাকা মানুষেরাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
দেশটির সতর্কবার্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় কণার ঝুঁকির ওপর। ইস্ফাহান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আদেলজাদেহ সতর্ক করে বলেছেন, তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে ও বিস্ফোরণস্থল থেকে দূরে থাকা মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি ইরনাকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের মূল স্থান থেকে দূরে থাকা ব্যক্তিদেরও সরকারি সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের বাড়ি বা কর্মস্থলে থাকা নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
ভিডিওতে প্রুশিয়ান ব্লুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম-১৩৭ শরীরে প্রবেশের কারণে সৃষ্ট নির্দিষ্ট ধরনের অভ্যন্তরীণ দূষণের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, তড়িৎচুম্বকীয় স্পন্দনের (ইএমপি) কারণে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি নির্দেশনা ও সর্বশেষ তথ্য জানতে ব্যাটারিচালিত রেডিও ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার সময় দেশটির কর্মকর্তারা জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তেজস্ক্রিয়তা স্থাপনাগুলোর বাইরে ছড়িয়ে পড়েনি। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটলে তেজস্ক্রিয় দূষণের ঝুঁকি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা নিতে পারে।
এদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশও নাগরিকদের ঘরে খাবার ও ওষুধের মতো জরুরি সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। ইরানের এই নির্দেশিকা এবং ইউরোপের এমন প্রস্তুতির মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
