বাবা বেঁচে আছেন, নাকি নেই, জানে না সন্তান। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও, বাবার নামের পাশে ‘জীবিত’ না ‘মৃত’ কোনটা লিখবেন-সেই সিদ্ধান্তও নিতে পারছেন না সন্তানরা। গত দেড় যুগে আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুমের শিকার পরিবারগুলোর বড় প্রশ্ন, কি ঘটেছিল তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে? বিচার হবে কবে? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস শুধু অপেক্ষা। গুম হওয়া স্বজন ফিরে আসবে এই অপেক্ষায় এখন সময় কাটে হাজারো পরিবারের। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে গুম হওয়া অনেকের স্বজনরা এখন শুধু প্রিয়জনের স্মৃতি হাতড়ে কান্না করেন। দিন-রাত অপেক্ষায় থাকেন এই বুঝি তার স্বজন ফিরে এলো। তাদের অপেক্ষা আর শেষ হয় না। স্বজনও আর ফিরে আসে না। এক দুঃসহ পরিস্থিতিতে সময় কাটছে তাদের।
গুম হওয়া হাজারো পরিবারের এমন অপেক্ষার মধ্যেই আজ রোববার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস।
বাবা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আনিশা ইসলাম ইনশার। নথিপত্রে বাবাকে মৃত নাকি জীবিত লিখবেন, বলতে পারছেন না কেউ?
ইনশা বলছিলেন, ‘আমার ভাই আমাকে বারবার বলছিল, আপু ছবিটা ওপরে তুলে ধরো। আঙ্কেলরা বাবাকে খুঁজে দেবে। এখন আর ও জিজ্ঞেস করেনা, বাবা কোথায়।’
মিরপুরের কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেন গুম হন ২০১৯ সালে। ৭ বছর ধরে তার ফেরার অপেক্ষায় পরিবার।
ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরীন জাহান স্মৃতি বলেন, ‘তার খোঁজে আজকেও দাঁড়িয়েছি। আমরা চাই না পরের বছর আবার দাঁড়াতে। এটার একটা সমাধান হোক। গুমের বিচার করতে এই সরকার আমাদের মতো ভিক্টিম পরিবারের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম হয়ে আর ঘরে ফেরেননি অন্তত ২৫১ জন ব্যক্তি। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, টানা দেড় যুগের আওয়ামী শাসনামলে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। তবে মোট গুমের সংখ্যা, জমাপড়া অভিযোগের চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা তদন্ত কমিশনের।
বাংলাদেশে গুমের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি ‘আয়না ঘর’। ২০২৪ সালের পর একাধিক ব্যক্তি গোপন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনেন। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, একাকী আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের অভিযোগ। গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশনও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপন আটককেন্দ্র থাকার তথ্য সামনে এনেছে। বেশ কয়েকটি আয়নাঘর পরিদর্শনও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত এসব গোপন ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দিশালার ছোট ছোট কক্ষে কীভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মানুষকে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হতো তারও চিত্র উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের সামনে।
গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সদর দপ্তরের ভেতরের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ, র্যাব, ডিবি ও সিটিটিসিসহ বিভিন্ন সংস্থার অন্তত ৮টির বেশি গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘরের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। ডিজিএফআই’র সদর দপ্তরের ইন্টারোগেশন সেল পরিদর্শনও করেছে কমিশন। সেখানে অন্তত ২২টি সেল ছিল।
কমিশন জোরপূর্বক গুমকে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের তদন্তে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দীর্ঘদিন আয়না ঘরে বন্দি থাকা জামায়তের সংসদ সদস্য আহমাদ বিন কাসেম আরমানের অভিযোগ, হাতেগোনা কয়েকটি মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। তাই এমন একটি আইন করতে হবে যাতে গুম নিরৎসাহিত হয়। আর মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম অভিযোগ করেন, তাদের দেওয়া ১৫০টি অভিযোগের একটিরও তদন্ত শেষ হয়নি।
মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘ক্যাপাবিলিটি আর ক্যাপাসিটি অনুযায়ী আমার মনে হয় না আসল ডেটা বা ফলাফল আমরা পাইনি সেখান থেকে। ভুক্তভোগী হাজারও পরিবার; এদের জন্য আসলে প্রতিটা দিনই কষ্টের। একজন গুম হয়নি, মরে যেতে হয়েছে আমাদের সবাইকে। আমরা বেঁচে আছি এখনো ওই বিচারটা দেখার জন্য।’
গুমের শিকার রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, ‘এমন আইন তৈরি করতে হবে যেটা এ ধরনের গুমের কাজকে নিরুৎসাহীত করবে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা হবে। স্বচ্ছতার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এমন একটি সংস্থা তৈরি হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা যেয়ে তাদের অধিকারের কথা বলতে পারবে।’
গুম প্রতিরোধে সম্প্রতি সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ কে আরও শক্তিশালী করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘এখানে বলা হয়েছে অভিযোগ দায়ের করতে হবে মানবাধিকার কমিশনের বদলে পুলিশকে। কিন্তু পুলিশ তো গুমের ঘটনায় জড়িত হতে পারে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো গুম আইন। তাই তাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে কতটা নিরপেক্ষ প্রতিকার পাওয়া যাবে সেটি নিয়ে তো প্রশ্ন থেকেই যায়।’
ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ছাড়াও আওয়ামী লীগ আমলে অন্তত ২৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত দল। যাদের কেউই আর ফিরে আসেনি।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুমের শিকার মানুষদের বিষয়ে তদন্ত ও তাদের পরিণতির বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। তবে নতুন করে কেউ এখন আর গুমের শিকার হচ্ছে না-এটি বড় স্বস্তির।
আরও পড়ুন: সারাদেশে শুরু হচ্ছে বিশেষ অভিযান
