, | |

মূলপাতা জাতীয়

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর বাতিল করে ভারতকে কী বার্তা দিলো বাংলাদেশ?


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুরোনো ছবি
রাজনীতি সংবাদ ডেস্ক প্রকাশের সময় :২৩ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৩৫ : অপরাহ্ণ

হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল দৃশ্যপট। ভারতের টানা প্রচেষ্টা এবং বহু আলোচনার পরও স্থগিত হয়ে গেলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর। আজকের আমরা বিশ্লেষণ করবো, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে এই মুহূর্তে ঠিক কী ঘটছে, ঢাকার এই কঠোর অবস্থান আসলে কীসের বার্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি কোন নতুন মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে।

দিল্লির প্রস্তাবে ঢাকার শর্ত
দিল্লি চেয়েছিল সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনের আগেই, অর্থাৎ আগস্টের শেষেই একটি দ্বিপাক্ষিক সফরের আয়োজন করতে। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী স্বয়ং মোদীর সাথে জরুরি বৈঠক করে এসে নতুন তারিখের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, ভারত সফরের আগে তৈরি করতে হবে সহায়ক পরিবেশ। আর এই সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য দিল্লিকে দুটি স্পষ্ট শর্ত দিয়েছে ঢাকা।

প্রথম শর্ত হলো, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনাসহ অন্যান্যদের দ্রুত ফেরত পাঠানো। এবং দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়েছে, ঢাকা এখন দিল্লির উত্তরের অপেক্ষায় আছে। অবশ্য শনিবার নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।

কেন এই ক্ষোভ ও কঠোর শর্ত?
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন হুট করে ঢাকার এই কঠোর অবস্থান? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, এর নেপথ্যে প্রধানত কাজ করছে তিনটি প্রধান।

১. দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা: ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত ৫ই আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য ও প্রেস ব্রিফিংয়ে তীব্র ক্ষুব্ধ হয় ঢাকা। বাংলাদেশ একে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে।

২. ‘হাসিনা কার্ড’ নিয়ে অবিশ্বাস: সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, একই সাথে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলা এবং বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা-এই দুই জিনিস একসাথে চলতে পারে না।

৩. সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস বা রিসেট: বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে-কূটনীতিতে ‘সার্বভৌম সমতা’ এবং ‘জাতীয় মর্যাদা’ রক্ষা ছাড়া কোনো আলোচনা হবে না। ঢাকা চায় খেলার আগে খেলার নিয়ম ঠিক করতে।

বাংলাদেশের কৌশলগত চাল?
বাংলাদেশের এই শর্ত দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত? বিশ্লেষকদের মধ্যে এটি নিয়ে দুটি ভিন্ন মতামত রয়েছে। একপক্ষ বলছেন, ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া বহু নেতা আছেন, যাদের কখনোই ফেরত পাঠানো হয়নি, যেমন তিব্বতের দালাই লামা। তাই ভারত হুট করে হাসিনাকে ফেরত দেবে না-এটা জানা সত্ত্বেও এ ধরনের শর্ত দিয়ে বৈঠক আটকে দেওয়া সম্পর্কে গভীর জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন বা জ্বালানি চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ঝুলে যেতে পারে।

 

তবে সাবেক কূটনীতিকদের অন্য পক্ষ বলছেন, এটা কোনো ঝোঁকের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পলিসির অংশ। এতদিন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লির যে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে পুরো সম্পর্কের ভিত্তিটিকেই এখন নতুন করে রিসেট করতে চাইছে বাংলাদেশ।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
তাহলে কি দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কে একদম অচলাবস্থা তৈরি হয়ে গেল? কূটনীতিকরা মনে করছেন, সম্পর্ক একেবারে আটকে যাওয়ার পথ এখনও তৈরি হয়নি। কারণ বাংলাদেশ এখন আর একক নির্ভরতার রাজনীতিতে নেই। একদিকে পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি, অন্যদিকে চীনের সাথে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত অংশীদারিত্ব-সব মিলিয়ে ঢাকা নিজের ভূরাজনৈতিক দরকষাকষির জায়গা অনেক শক্তিশালী করেছে। দিল্লিকেও এখন বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের পুরোনো রাজনীতি আর নেই; তাদেরও সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা মেনে নিয়েই টেবিলে বসতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এবং ঐতিহাসিক ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে আলোচনা কোনো না কোনো সময় ফের শুরু করতেই হবে। তবে শীর্ষ বৈঠকের আগে ঢাকার দেওয়া এই শর্ত এবং শক্ত অবস্থান প্রমাণ করে-দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে বাংলাদেশ এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

আরও পড়ুন: ইলিয়াস আলী গুম: বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার সাইফুর কারাগারে

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর