মন্ত্রিসভায় প্রথম দফার রদবদলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শামা ওবায়েদ ইসলাম বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে একই মন্ত্রণালয়ে এখন দুই প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন।
এক মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রীর নতুন এই ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি বিবেচনায় নিয়েই এই কাঠামো করা হয়ে থাকতে পারে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে শুরু করে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত, প্রবাসীকল্যাণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হয় মন্ত্রণালয়টিকে। ফলে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে কাজের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে থাকবেন। তার অনুপস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের কাজ চালিয়ে নিতে নতুন এই ব্যবস্থা করা হয়ে থাকতে পারে। কাজ ভাগ করে দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি এমনিতেই বেড়েছে। তিনি আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করতেন, এবার সেটিই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমন্ত্রীর পদে যুক্ত হয়েছে।
এক মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী কেন?
একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় খুব একটা দেখা যায় না। তবে এ ধরনের নিয়োগে আইনি বাধা নেই। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু একটি মন্ত্রণালয়ে কতজন প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সীমা দেওয়া হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, একই মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী থাকলে কাজের ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা বা অসুবিধা নেই।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নতুন ব্যবস্থায় মন্ত্রণালয়ের কাজ আলাদা করে দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ভাগ করা যেতে পারে। একজন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিষয় দেখার পাশাপাশি অন্যজন বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা বা নির্দিষ্ট কোনো কৌশলগত বিষয়ে দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নানা বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।
অন্যদিকে হুমায়ুন কবির এত দিন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনায় তাকে নিয়মিত দেখা গেছে। জুলাই মাসেও পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি।
শুক্রবারের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পর সেই ভূমিকা এবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে শামা ওবায়েদও আগের পদে বহাল রয়েছেন।
দায়িত্বের বণ্টনই এখন গুরুত্বপূর্ণ
দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকলেও তাদের দায়িত্ব অভিন্ন হবে এমনটি নয়। সরকারের কর্মবণ্টন অনুযায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের আলাদা বিষয়ে দায়িত্ব দিতে পারবেন। ফলে কোন প্রতিমন্ত্রী কোন দেশ, অঞ্চল বা কূটনৈতিক ইস্যু দেখবেন, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব স্পষ্টভাবে ভাগ করা গেলে মন্ত্রণালয়ের কাজের চাপ কমবে এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক বিষয়ে সরকারের তৎপরতা বাড়তে পারে। তবে দায়িত্বের মধ্যে যেন কোনো ধরনের দ্বৈততা বা সমন্বয়হীনতা তৈরি না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক কূটনীতি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে সরকারকে।
এর মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি কাজের পরিধি সামলানোর নতুন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সমন্বয় এবং সরকারের অভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ওপর।
আরও পড়ুন: সৌদি-তুর্কি-পাকিস্তানের জোটে যাওয়া নিয়ে যা বললেন নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
