ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেছে। ১৯৯৮ সালে নিজের হাতে গড়া দল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ (টিএমসি) থেকে বিদায় নিতে হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়।
আজ সোমবার কলকাতার নিউ টাউনের একটি পাঁচতারকা হোটেলে আয়োজিত বিশেষ অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর। বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট চরমে পৌঁছায়। সোমবারের বিশেষ অধিবেশনে কণ্ঠভোটে হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়কে দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। নতুন ১০ সদস্যের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে সহ-সভাপতি হয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ ও সাবিনা ইয়াসমিন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান ও সন্দীপন সাহা এবং কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামান আনসারিকে।
এই বিশেষ অধিবেশনের মঞ্চে মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বি আর আম্বেদকরের ছবি থাকলেও সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। মূলত অভিষেকের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ থেকেই এই বিদ্রোহের সূত্রপাত।
বৈঠকের শুরুতেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সাংগঠনিক সংকটের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ ২০২২ সালে সেই কমিটি গঠিত হয়েছিল। এরপর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি তৈরি হয়নি। সেই কারণেই জরুরি ভিত্তিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।এরপর দ্রুত গতিতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে ধ্বনি ভোটে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই দলটির বিদ্রোহী নেতা তথা উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানান। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে বলে বিদ্রোহীদের দাবি।
রাজ্য বিধানসভার পাশাপাশি ভারতের লোকসভাতেও বড় ধাক্কা খেয়েছে মমতা শিবির। ২৮ জন লোকসভা এমপির মধ্যে ২০ জনই তৃণমূল সংসদীয় দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া’ তে যোগ দিয়েছেন এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন জানিয়েছেন।
কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করেছে। এর পরপরই তৃণমূলের এই ঐতিহাসিক ভাঙন দলটিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে।
দলের বিদ্রোহী শিবির জানিয়েছে, সাংগঠনিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন কমিটি না করায় এই ‘সাংবিধানিক সংকট’ দূর করতে তারা নতুন নেতৃত্ব পুনর্গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন।
আরও পড়ুন: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিজেপির, নিজের ডেরাতেও হারলেন মমতা
