পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বিস্ফোরক মন্তব্য করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন।
আজ মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে তিনি দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তিনি সব জানেন এবং এর সঙ্গে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের যোগসূত্র রয়েছে।
মমতা বলেন, ‘‘হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছিল। তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। তাদের গ্রেপ্তারের পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আমাকে ফোন করে বলেন, ‘আপ থোরা বেঙ্গল পুলিশকে বলদো, এ বাত বাহার মে না যায় (আপনি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশকে একটু বলে দিন, এই বিষয়টি যেন বাইরে প্রকাশ না পায়)।’’
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন, ‘হাদিকে কাকে দিয়ে খুন করানো হয়েছিল? কার নাম বেরিয়েছিল? সরকার বদলালেও আমি অনেক কিছু জানি। কিন্তু দেশের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমি নির্দিষ্ট কোনো নাম প্রকাশ করছি না। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। তাই ওই নাম আমি প্রকাশ করবো না, করলে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে যেতে পারে।’
তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর মমতা ব্যানার্জীর এই ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিষয় এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে তার এই দাবি নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ৩২ বছর বয়সী শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত মুখ এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক।
ঝালকাঠির এক মাদ্রাসা শিক্ষকের সন্তান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রখর ভারত-বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলার পাশাপাশি তিনি ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার এই অবস্থান তাকে তরুণ সমাজ তথা দেশের আপামর মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
এই রাজনৈতিক উত্থানের মাঝেই ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে এক সুপরিকল্পিত গুপ্তহত্যার শিকার হন হাদি। জুমার নামাজের পর একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা আততায়ীরা খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল থেকে এভারকেয়ার হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানায়, মূল শুটার ছিল ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেন। অপরাধ সংঘটিত করার পর তারা ভারতে পালিয়ে যান।
চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুতে এই ফয়সাল এবং আলমগীরকে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ।
আরও পড়ুন: এক সাহসী কণ্ঠের প্রস্থান
