পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে প্রায় ২১ ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ আলোচনার পরও ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। এতে দুই দেশের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা কার্যত ভেস্তে গেছে। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তান ছেড়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
আজ রোববার সকাল ৭টা ৮ মিনিটে জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ইসলামাবাদের বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফোর্স টু প্লেনে চড়ে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হন। যাওয়ার আগে প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিদায় নেন জেডি ভ্যান্স।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির লাইভে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়লো।
এরআগে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা টানা ২১ ঘণ্টা আলোচনা করেছি এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হয়েছে-এটা সুসংবাদ। তবে দুঃসংবাদ হলো, আমরা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারিনি।’
জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘‘আমি মনে করি এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বেশি খারাপ খবর। আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে আমরা যে নিশ্চয়তা চেয়েছিলাম, তারা তা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব দিয়েছে। আলোচনা চলাকালীন আলোচক দল ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল। আমরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছিলাম। আমি জানি না গত ২১ ঘণ্টায় আমরা তার সঙ্গে কতবার কথা বলেছি, হয়তো ছয় বা বারো বারের মতো।’
এদিকে বৈঠকের ব্যর্থতা নিয়ে ইরানের প্রতিনিধি দল এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সংবাদ সম্মেলন করেনি। তবে ইরানি প্রতিনিধি দলের সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদামাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে-হরমুজ প্রণালি, পরমাণু প্রকল্পসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মত পার্থক্যের কারণেই ব্যর্থ হয়েছে বৈঠক।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্সে (আগের নাম টুইটার) লিখেছেন, ইসলামাবাদের বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে-এর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক ইস্যু, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরান ও অঞ্চলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অবসান।
ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করছে বিপরীত পক্ষের ‘গুরুত্ব ও সদিচ্ছা’, অতিরিক্ত দাবি থেকে বিরত থাকা এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ মেনে নেওয়ার ওপর।
খবরে বলা হয়েছে, আলোচনায় অংশ নেওয়া দুই পক্ষই প্রস্তাবিত খসড়া নিয়ে নিজেদের বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে পরামর্শ করতে সাময়িক বিরতি নিয়েছে। খসড়া প্রস্তুত হলে আবার আলোচনা শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে গতকাল শনিবার বিকেলে ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে ‘ইসলামাবাদ টকস’ নামে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছিল। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই ‘ইসলামাবাদ টকস’-এর ওপর নির্ভর করছিল মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী ‘হরমুজ প্রণালি’ ইরানের নিয়ন্ত্রণে অবরুদ্ধ থাকায় তেলের দাম আকাশচুম্বী এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি হুমকির মুখে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রথমদিনের বৈঠকে যেসব আলোচনা হলো
