‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়। সিনিয়র-জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে।’
আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে এমন কথা বলেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
গুম-খুনের ঘটনায় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের (বরখাস্ত) বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম জবানবন্দি দেন জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরীণ করে জিজ্ঞাসাবাদের সময় র্যাব ও সামরিক সদস্যদের নির্যাতনে আনুমানিক ৫০ জন মৃত্যুবরণ করে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শান্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন। এ সময় তিনি তার আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তার মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হন।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘পেশাদার কর্মকর্তাদের সরিয়ে অনুগত কর্মকর্তাদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো, শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।’
ইকবাল করিম বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ডিজিএফআই। বিভিন্ন সময়ে তারা লোকদের উঠিয়ে এনে নিজেদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী-রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। তারা তারেক রহমানকেও তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করেন।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে ডিজিএফআইয়ের সেলে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যে কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা কিছু করা যায় ভেবে এমন মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর হয়ে যায় তাদের। অর্থাৎ যা ইচ্ছা তা-ই করা যায় ভাবতে শুরু করেন তারা।’
ইকবাল করিম বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে যখন র্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্বক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে।’
সেনাবাহিনী পরিচালিত অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘অপারেশন ক্লিন হার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরবর্তীতে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।’
আরও পড়ুন: পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা ও ভারতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
