, | |

মূলপাতা অর্থ-বাণিজ্য

শিপিং এজেন্টসের নির্বাচন: সরে দাঁড়ালেন সম্মিলিত পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় :৩ অক্টোবর, ২০২৫ ৪:১৮ : অপরাহ্ণ

শিপিং এজেন্টদের সংগঠন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের আগেই ধরাশায়ী হয়েছে আওয়ামী লীগপন্থী সম্মিলিত পরিষদ। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন প্যানেলটির চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসান ইকবাল চৌধুরী আবির।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজনীতি সংবাদকে তিনি এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে তিনি এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেননি।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি প্যানেল। একটি হলো ঐক্য পরিষদ, আরেকটি হলো সম্মিলিত পরিষদ। শিপিং এজেন্টরা ঐক্য পরিষদকে ‘বিএনপিপন্থী’ আর সম্মিলিত পরিষদকে ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

শিপিং এজেন্টদের মধ্যে প্রচার আছে, চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ঐক্য পরিষদকে নেপথ্যে সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছোট ভাই। অপরদিকে সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক সম্মিলিত পরিষদকে নেপথ্যে সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আমীর হুমায়ুন ও আমিরুল হক দুজনই দুই প্যানেলকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি রাজনীতি সংবাদের কাছে অস্বীকার করেছেন।

আওয়ামী লীগপন্থী শিপিং এজেন্টরা ‘সম্মিলিত পরিষদ’ ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটেই আগেই তারা ঐক্য পরিষদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। তারা নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি। নির্বাচনে ২৪ পদের বিপরীতে মাত্র ৮ জন প্রার্থী নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছে এই প্যানেল। এর মধ্যে প্যানেলটির চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসান ইকবাল চৌধুরী ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এতে ভোটের মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সম্মিলিত পরিষদ।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। কিন্তু শেষ দিনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি সম্মিলিত পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসান ইকবাল। নির্বাচনের ৬ দিন আগে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানালেন তিনি।

আহসান ইকবাল চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি ভোটের মাঠে নেই, সরে দাঁড়িয়েছি। আমি ভোটের কোনো ক্যাম্পেইন করছি না। ভোটও দিতে যাবো না।’

হঠাৎ কেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন-এই প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার প্যানেলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। যে কারণে আমি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারিনি। আমি এখন ৬-৭ জন লোক নিয়ে চেয়ারম্যান হয়েও কী করবো?’

তাহলে আপনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি কেন?-এই প্রশ্নের উত্তরে আহসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে হলে প্রার্থীকে স্বশরীরে নির্বাচন বোর্ডে যেতে হবে। কিন্তু আমার স্বশরীরে সেখানে যাওয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল না।’

প্রসঙ্গত, গত ২ অক্টোবর আহসান ইকবাল চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন।

চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসান ইকবাল চৌধুরী ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এখন ভোটের মাঠে সম্মিলিত পরিষদের ৭ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।এরা হলেন-দুই সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থী বেঙ্গল শিপিং লাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মালেক ও সীকম শিপিং লাইনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহুর আহমেদ। সহসভাপতি প্রার্থী সিনোবেন শিপিং কোম্পানি লিমিটেডের আখতার কামাল চৌধুরী। চার পরিচালক প্রার্থী-এ বি সি শিপিং লাইনস লিমিটেডের মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, ইন্টারপোর্ট শিপ এজেন্টস লিমিটেডের আহমেদ তাহসীন আসাদুল্লাহ, সুলতান শিপিং লাইনসের মোহাম্মদ শহীদ উল্ল্যাহ চৌধুরী এবং মিউচুয়াল শিপিং লিমিটেডের জুনায়েদ আহমেদ রাহাত।

সম্মিলিত পরিষদের আহসান ইকবাল চৌধুরী ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এখন চেয়ারম্যান প্রার্থী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুজনের মধ্যে। এরা হলেন-ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী নাফ মেরিন সার্ভিসেসের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ভেগা মেরিন (প্রা.) লিমিটেডের পরিচালক আহসানুল হক চৌধুরী।

প্যানেলের চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সম্মিলিত পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থী জহুর আহমেদ রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘তিনি (আহসান ইকবাল চৌধুরী) নির্বাচনে তার সঙ্গে আরও লোকজন নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদেরকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। তাই তিনি চিন্তা করছেন, আমি একা চেয়ারম্যান হয়ে কী করবো।’

সম্মিলিত পরিষদের সহসভাপতি প্রার্থী আখতার কামাল চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘তিনি (আহসান ইকবাল চৌধুরী) যদি নিজ থেকে সরে দাঁড়ান, সেখানে কারও কিছু বলার নেই। এখন অন্য কেউ চেয়ারম্যান হবেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ভেগা মেরিন (প্রা.) লিমিটেডের পরিচালক আহসানুল হক চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আহসান ইকবাল চৌধুরী কেন সরে দাঁড়িয়েছেন তা আমি জানি না।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কতটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন-এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নোংরামি থেকে বের হতে হলে একজন ভালো প্রার্থীকে বোর্ডে আসতে হবে। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তিনবার বোর্ডে ছিলাম। সে হিসাবে ভোটারদের কাছে আমার একটা পরিচিতি আছে। আর আমার যেহেতু প্যানেল নেই, তাই তেমন তৎপরতা চালাতে হবে না।’

জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সম্মিলিত পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী আহসান ইকবাল চৌধুরী ও সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থী জহুর আহমেদসহ সংগঠনটির ৮ নেতা নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে শিপিং এজেন্টসের নির্বাচন স্থগিত করে প্রশাসক নিয়োগের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিটিও) বরাবর একটি চিঠি দেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই অভিযোগের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তবে শুনানিতে ঐক্য পরিষদের কাউকে ডাকা হয়নি। শুনানি শেষে এখনো পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে নির্বাচনে ২৪ পদের বিপরীতে ২৪ জন প্রার্থী দিয়েছে ঐক্য পরিষদ। এদের মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেন নাফ মেরিন সার্ভিসেসের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন চৌধুরী, দুই সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেন-কে এম সি শিপিং লাইনের আজিম রহিম চৌধুরী ও সেভেন সিজ শিপিং লাইনসের মোহাম্মদ আলী আকবর, দুই ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হলেন-এ. এ. শিপিং সার্ভিসেসের ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ মশিউল আলম স্বপন ও মার্স শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকসের ক্যাপ্টেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। বাকি ১৯ পরিচালক প্রার্থীরা হলেন-আরগো শিপিং সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলী, এশিয়াবাল্ক মেরিটাইম প্রা. লিমিটেডের অঞ্জন মজুমদার, কে এস এম শিপিং এজেন্সিস (প্রা.) লিমিটেডের কাজী মনসুর উদ্দিন, ইউনাইটেড সী ট্রান্সপোর্টের সরফরাজ কাদের রাসেল, গো পোর্ট শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিংয়ের মোহাম্মদ দিদারুল আলম চৌধুরী, ওশান কিং কন্টেনার লাইনসের মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন খান (হাসান), মাল্টিমুভ শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস, এইচ সি মেরিন লিমিটেডের নুর উদ্দিন নবী, কনটেইনার ওয়ার্ল্ড এক্সেপ্রেসের এস এম এনামুল করিম, শামসে জোহাকে শিপিং লিমিটেডের আকিব হাসনাত, এভার চিয়ার শিপিং লাইনসের মোহাম্মদ শফিউল আলম, এস কে শিপিং বিডির এটিএম জহিরুল ইসলাম, আমান শিপিং এজেন্সির আনোয়ারুল কবির কামরুল, মেরিটাইম সার্ভিসেস লিমিটেডের মুয়াম্মার আহমদ, পার্ক শিপিং লাইনের মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পাটোয়ারী, অ্যাডমিরাল শিপিং লাইনসের মোহাম্মদ শাহীন, প্রাইমেক্স লজিস্টিক ইন্টারন্যাশনালের ফরহাদুল আলম চৌধুরী, সাউথ ইস্ট মেরিটাইমের মো. মনসুর আলী এবং সামুন্দা শিপিং লাইনস লিমিটেডের মাসুদ আহমেদ।

ঐক্য পরিষদের অন্যতম নেতা এবং এ. এ. শিপিং সার্ভিসেসের ম্যানেজিং পার্টনার মশিউল আলম স্বপন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা হয়নি। আমরা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু আওয়ামী লীগপন্থী সম্মিলিত পরিষদের নেতারা ষড়যন্ত্র করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ করে নির্বাচন বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগের চক্রান্ত করছে। শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশন হলো চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। আমরা মনে করছি, হয়তো চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করতে সম্মিলিত পরিষদের নেতারা শিপিং এজেন্টসের নির্বাচন বানচাল করতে চায়।’

বাণিজ্য সংগঠন নতুন বিধিমালার কারণে এবারের শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশেনের নির্বাচনে শিপিং এজেন্সির মালিক বা শেয়ার হোল্ডার ছাড়া কেউ প্রার্থী হতে পারেননি। আগে শিপিং এজেন্সির মালিকের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠানের জিএম, ম্যানেজারসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রার্থিতার সুযোগ পেতেন। এ ছাড়া আগে পরপর দুইবার পরিচালক নির্বাচিত হওয়া ব্যক্তিরা এবার প্রার্থী হতে পারেননি।

শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশেনের পরিচালনা পর্ষদের মোট ২৪টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে একজন চেয়ারম্যান, দুজন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, দুজন ভাইস চেয়ারম্যান এবং জেনারেল ক্যাটাগরির ১৩ জন ও এসোসিয়েট ক্যাটাগরির ৬ জন পরিচালক।

‘বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশেনের সদস্যরা এবার ২৪টি পদে সরাসরি ভোট প্রয়োগ করবেন। চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে।

পরিচালনা পর্ষদের ২৪ পদের বিপরীতে দুই প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছেন ৩২ জন। এর মধ্যে ঐক্য পরিষদের প্রার্থী ২৪ আর সম্মিলিত পরিষদের প্রার্থী হলো ৮ জন। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা হলো ১৬১ জন। আগামী ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস নেভি কনভেনশন সেন্টারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

আরও পড়ুন:

চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে জোট বাঁধলো আ.লীগ-বিএনপির দুই ব্যবসায়ী

চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে বিএনপি-আ.লীগ ‘সমঝোতা’

চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র নিলেন যারা

চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের ট্রাইব্যুনালে কী হবে?

মন্তব্য করুন
Rajniti Sangbad


আরও খবর