চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন ঘিরে ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর মধ্যে মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষের নেতা ও চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী অপর দুটি পক্ষের সঙ্গে মেরুকরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। অপরদিকে এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের অপর পক্ষ এবং জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের মধ্যে মেরুকরণ হয়েছে। দুই পক্ষ মিলে একটি প্যানেল করতে যাচ্ছে।
চিটাগাং চেম্বারের আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের তিনটি পক্ষ এবং জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীরা অংশ নিচ্ছেন। বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের তিনটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন-চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছোট ভাই আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হকের ছোট ভাই এস এম নুরুল হক এবং চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই আমজাদ হোসেন চৌধুরী। অপরদিকে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে রয়েছেন অ্যাকর্ড হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান শাহজাহান মহিউদ্দিন।
চারটি পক্ষের মধ্যে এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের অংশ এবং জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। নির্বাচনে যৌথভাবে প্যানেল দেওয়ার বিষয়ে তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা যৌথভাবে আজ বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

চেম্বারের আসন্ন নির্বাচনে ‘ফ্যাসিবাদী পরিবারতন্ত্র পুনর্বহালের অপচেষ্টার প্রতিবাদে’ তারা এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চট্টগ্রাম সচেতন ব্যবসায়ী সমাজের আহ্বায়ক এস এম নুরুল হক। এতে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ী ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি শাহজাহান মহিউদ্দিনও অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চারটি পক্ষের মধ্যে প্রার্থী সংকটে পড়েছেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিএনপিপন্থী ব্যবসায়ীদের প্যানেলটি। এই প্যানেলটি নির্বাচনের আগেই বিনা ভোটে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডিয়াম (সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি) নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তাদের আরও সাতটি পদ লাগবে। কিন্তু আমীর হুমায়ুন প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছেন না। ভোটের লড়াইয়ে আমীর হুমায়ুনের প্যানেলের সাতজন প্রার্থী বিজয়ী হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এতে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে!
জানা গেছে, সভাপতি নির্বাচনে আমীর হুমায়ুন টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপের ছয়টি ভোট পাবেন কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
ট্রেড গ্রুপের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে বলেন, আমাদের প্যানেল থেকে যাকে সভাপতি প্রার্থী করার কথা শোনা যাচ্ছে, তাকে যদি প্রার্থী করা হয় তিনি টাউন ও ট্রেড থেকে দুটি ভোট পাবেন না। কারণ এই প্রার্থীকে আমরা পছন্দ করি না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থী সংকট ও ভোটের লড়াইয়ে সাতজন প্রার্থীর বিজয়ী হওয়া নিয়ে সংশয়ের কারণে আমীর হুমায়ুন এরই মধ্যে অপর দুটি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।
জানা গেছে, আমীর হুমায়ুন চৌধুরী গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তার মেহেদীবাগের বাসায় আমজাদ হোসেন চৌধুরীকে ডেকে আনেন। তিনি তাকে তার প্যানেল থেকে সিনিয়র সহসভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু আমজাদ হোসেন সাথে সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তবে আমজাদ হোসেন আমীর হুমায়ুনকে পাল্টা একটা প্রস্তাব দেন। আমীর হুমায়ুন সভাপতি পদে প্রার্থী হলে আমজাদ হোসেন সিনিয়র সহসভাপতি পদে প্রার্থী হবেন বলে জানান। কিন্তু আমীর হুমায়ুন সভাপতি পদে প্রার্থী হতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে দুজনের মধ্যে আর সমঝোতা হয়নি।
এ সময় আমীর হুমায়ুনের মেহেদীবাগের বাসায় উপস্থিত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজনীতি সংবাদকে এ তথ্য জানান।
এই বিএনপি নেতা জানান, আমজাদ হোসেন চৌধুরী ওই দিন আমীর হুমায়ুনের বাসায় মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তারা একান্তে বৈঠকে বসেন। আধা ঘন্টা পর তাদের এই বৈঠক শেষ হয়।
এ বিষয়ে জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হয় আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে। কিন্তু তিনি এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
আমীর হুমায়ুন চৌধুরীর ‘প্রস্তাবের’ বিষয়ে জানতে চাইলে আমজাদ হোসেন চৌধুরী রাজনীতি সংবাদের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেননি, আবার অস্বীকারও করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না।’
এদিকে ওই দিন সন্ধ্যায় আমজাদ হোসেন চৌধুরীর পর চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন আমীর হুমায়ুন চৌধুরী। চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের ‘নীতিনির্ধারকের’ ভূমিকা রাখছেন নুরুল আমিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আমীর হুমায়ুন তার প্যানেলের হয়ে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের নির্বাচন করার ‘প্রস্তাব’ দেন নুরুল আমিনকে। কিন্তু নুরুল আমিন ‘বিতর্কিত’ টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে নির্বাচন করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তাতে সাড়া দেননি। ফলে তাদের মধ্যে আর সমঝোতা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল আমিন রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমীর হুমায়ুন সাহেব আমাকে ফোন করে তার বাসায় নিয়ে যান। চেম্বারের বিষয়ে তিনি নানা কথা বলেছেন। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি, বিতর্কিত টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। এ নিয়ে আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। অনিয়মকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। তিনি আমার কথায় সায় দেন। কিন্তু পরে শুনলাম, তিনি টাউন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে লতিফের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করেছেন। যা আমি আশা করিনি।’
আমীর হুমায়ুন তার প্যানেলের হয়ে জামায়াতপন্থী ব্যবসায়ীদের নির্বাচন করার বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন কিনা-এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘চেম্বারের নির্বাচনের বিষয়ে তিনি অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু আমি বলেছি, আগে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ বাতিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে। এরপর অন্য আলোচনা।’
এদিকে আমীর হুমায়ুন চৌধুরী তার প্যানেল থেকে সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমীরুল হককে ‘সভাপতি প্রার্থী’ করতে যাচ্ছেন বলে ব্যবসায়ী মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু তাকে ‘সভাপতি প্রার্থী’ করার খবরে আমীর হুমায়ুনের প্যানেলের ব্যবসায়ীদের অনেকে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমীর হুমায়ুন চৌধুরীর প্যানেলের একজন প্রার্থী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, যিনি চেম্বারের সভাপতি হবেন তিনি শুধু সফল ব্যবসায়ী হলে হবে না, তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণও থাকতে হবে। আর নেতৃত্ব দিতে হলে বিনয়ী হতে হবে। আর চেম্বার সভাপতির শুধু এলিট শ্রেণির ব্যবসায়ীদের কাছে নয়, সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। যার মধ্যে এসব গুণ নেই তাকে তো সভাপতি হিসেবে কেউ সমর্থন করবে না।
উল্লেখ্য, আগামী ১ নভেম্বর দেশের শতবর্ষী বাণিজ্য সংগঠনে চিটাগাং চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফরম বিক্রি হবে। মনোনয়ন ফরম জমাদানের শেষ তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর। ৫ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে।
চিটাগাং চেম্বারের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ। ওই নির্বাচনে মাহবুবুল আলম-নুরুন নেওয়াজ সেলিম পরিষদ জয়লাভ করে। এর পরের পাঁচ মেয়াদের নির্বাচনে কোনো ভোটাভুটি হয়নি। বিনাভোটে চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচিত হয়েছে। দীর্ঘ ১২ বছর পর এবার চিটাগাং চেম্বারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:
চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচনে বিএনপি-আ.লীগ ‘সমঝোতা’
চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাইতে পারেন আমজাদ হোসেন!
৩১ আগস্ট রাতে কী হয়েছিলো চিটাগাং চেম্বারে?
শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের নির্বাচনে লড়ছেন কারা?
