ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও নির্বাচন পদ্ধতি বদল নিয়ে রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
প্রচলিত নাকি পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন-এই ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে মতবিরোধ বাড়ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের। বিএনপি পিআর পদ্ধতির কঠোর বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল এই পদ্ধতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ফলে পিআর পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষের বক্তব্য রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
বিদ্যমান পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদে ৩০০ জনপ্রতিনিধি সরাসরি নির্বাচিত হয়ে থাকেন, আসনভিত্তিক ফলাফলে। অর্থাৎ যে প্রার্থী তুলনামূলক বেশি ভোট পান, তিনিই প্রতিনিধিত্ব করেন নির্বাচনী এলাকার। এর বিপরীতে বর্তমানে রাজনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনায় সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন ইস্যু। এ পদ্ধতিতে সারাদেশে পাওয়া ভোটের অনুপাতে নির্ধারণ হবে দলগুলোর আসন।
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান এককক্ষের পরিবর্তে সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষে প্রচলিত পদ্ধতি আর উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৫টি। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে চারটি দলের নিবন্ধন বাতিল রয়েছে এবং আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। ফলে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৮টি দল পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের পক্ষে। বিপক্ষে অবস্থান ২৮টি দলের। চারটি দল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। কিছু দল আংশিকভাবে এই পদ্ধতির পক্ষে। বিপক্ষে থাকা দলগুলো মূলত বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী। এর বাইরে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) পিআর পদ্ধতির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। মূলধারার ইসলামী দলের মধ্যে পাঁচটি দল পিআর পদ্ধতির পক্ষে, দুটি বিপক্ষে এবং দুটি দল অবস্থান পরিষ্কার করেনি।
পিআর পদ্ধতি নিয়ে কোন দলের কী অবস্থান
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), তৃণমূল বিএনপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) ও বাংলাদেশ কংগ্রেস।
ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে। আর বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এই পদ্ধতির বিপক্ষে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অন্যদিকে, বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে রয়েছে বিএনপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, গণফোরাম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (নিম্নকক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এবং উচ্চকক্ষ পিআর), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম (নিম্নকক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এবং উচ্চকক্ষ পিআর), বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি), নাগরিক ঐক্য (নিম্নকক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এবং উচ্চকক্ষ পিআর), গণসংহতি আন্দোলন (নিম্নকক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থায় এবং উচ্চকক্ষ পিআর)।
জামায়াত-এনসিপি মনে করে, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন প্রতিটি ভোটের মূল্য নিশ্চিত করবে। ভোটে কালো টাকার ছড়াছড়ি, পেশিশক্তি, কেন্দ্র দখলসহ নির্বাচনী অনিয়ম ঠেকাতে ভূমিকা রাখবে।
তবে কোনো কক্ষেই বিদ্যমান পদ্ধতির বাইরে যেতে নারাজ বিএনপিসহ কয়েকটি দল। এ নিয়ে দলগুলো যদি এক জায়গায় না আসে, তাহলে ফয়সালা কীভাবে হবে তা নিয়েও আছে বিতর্ক। বিএনপি বিষয়টি পরবর্তী সংসদের জন্য রাখতে চাইলেও ভিন্নমত অন্যদের।
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘দেশে অনেকগুলো দল রয়েছে, যাদের নির্দিষ্ট কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কিন্তু সারা দেশে তাদের কাছে ভোট আছে। সুতারাং সবগুলো সমর্থনকে একসঙ্গে করলে যদি এক শতাংশ পায়, তারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন নিয়ে যদি দেখা যায় মৌলিক বিষয়ে দলগুলো একমত হতে পারছি না, তখন আমাদের পরামর্শ গণভোটে যাওয়া।’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘যদি প্রথমবার আমরা অন্তত একটা কক্ষে সংখ্যানুপাতিক করি। তাহলে নিম্নকক্ষে কেউ যদি দখলদারিত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়, তখন ব্যালেন্স হবে উচ্চকক্ষ। আমরাতো অবশ্যই বলেছি গণপরিষদ নির্বাচন। অধিকাংশ দল যদি গণভোট চায় আমরাও তাতে রাজি। কিন্তু কোনোভাবে এটা পরবর্তী সংসদের জন্য ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘কেউ যদি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি নিয়ে যায়, জনগণ যদি তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে তাহলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব সে করবে। প্রচলিত নির্বাচনে ভয় কেন। জনগণ মাস্টার, তারাই ঠিক করবে।’
তবে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিসহ মৌলিক কিছু বিষয়ে সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোকে বারবারই ছাড় দেয়ার কথা বলছে ঐকমত্য কমিশন।
আরও পড়ুন: ১৯ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে জামায়াত
