পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৬ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদরদপ্তরে বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ নির্মম, নৃশংস ও ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে রচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
২৫ ফেব্রুয়ারির ক্ষত আজও পীড়া দেয় দেশবাসীকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভীষিকাময় ও শোকাবহ এ দিনটি প্রথমবার জাতীয় শহীদ সেনা দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হচ্ছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে সরকার প্রতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়।
দিবসটি উপলক্ষে আজ বনানীর সামরিক কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদলের পর ইতিহাসের ভয়ংকর এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে তদন্ত এবং নেপথ্যের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কারণ এর সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জড়িত, সে সঙ্গে ছিল বিদেশি ষড়যন্ত্রও। পরে ২৩ ডিসেম্বর এ ঘটনায় সাত সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর রহমানকে কমিশনের প্রধান করা হয়। সেই কমিশন এখন পর্যন্ত সেনাসদস্যসহ অন্তত ৩৭ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে মর্মান্তিক নৃশংস বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তখন সকাল ৯টা ২৭ মিনিট। দরবার হলে চলমান বার্ষিক দরবারে একদল বিদ্রোহী বিডিআর সৈনিক ঢুকে পড়ে। সিপাহি মঈন নামে একজন বিডিআর সদস্য মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা।
বিডিআরের বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর বীভত্স ঘটনার সৃষ্টি করে।
এ সময় তারা বিদ্রোহের নামে বাহিনীর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ছাড়া নারী ও শিশুসহ ১৭ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়।
এ ভয়াবহ ঘটনায় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শপথ গ্রহণকারী দেশের সুরক্ষা কবচ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হারায় তার মেধাবী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের, যা সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ দিনটি শুধু বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নয়, পুরো জাতির জন্যই শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক।
দেশের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ওই নৃশংস ঘটনাকে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর প্রথম বড় ধরনের আঘাত হিসেবেই মূল্যায়ন করে থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারেরও মূল্যায়ন, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধেও বাংলাদেশ একসঙ্গে এতজন সেনা কর্মকর্তাকে হারায়নি।
পিলখানায় নারকীয় এই হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তাদের নিহতের ঘটনায় দণ্ডবিধি আইনে করা হয় হত্যা মামলা। অপরটি হয় বিস্ফোরক আইনে। বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলাটি ১৫ বছর ধরে সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্যে আটকে আছে।
হত্যা মামলায় নিম্ন আদালত ২০১৪ সালে ১৫২ বিডিআর জওয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৬১ জনকে। সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান আরো ২৫৬ জন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। ২০১৭ সালে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জওয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবন দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় আরো ২০০ জনকে। খালাস পান ৪৫ জন।
আরও পড়ুন:
সেদিন পিলখানায় কী ঘটেছিল, চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন সাবেক ডিজি মইনুল
পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুললেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ
পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা ও ভারতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
