যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) দেশটির সাবেক নগর ও দুর্নীতিবিরোধী মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। টিউলিপের বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ হিসেবে এনসিএ-এর গোয়েন্দারা বাংলাদেশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে গোপনে বৈঠকের জন্য ঢাকা সফর করেছিলেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গত মাসে হওয়া এই বৈঠকে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, তারা টিউলিপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নতুন তথ্য যোগাড় করতে সমর্থ হয়েছেন।
টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো, তার খালা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে রাশিয়ার সঙ্গে একটি বিতর্কিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি করেছিল। সেই প্রকল্প থেকে টিউলিপ এবং তার পরিবারের সদস্যরা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার তছরুপ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। এ ছাড়া, টিউলিপের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে একাধিক আবাসন উপহার হিসেবে পেয়েছেন, যা তিনি সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন করে গিয়েছিলেন।
সাবেক ট্রেজারিমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক এবং তার মা শেখ রেহানা ও খালা শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারে পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড (৫ বিলিয়ন ডলার) আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটম নির্মাণ করে এবং এর ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করেছে রাশিয়া। ২০১৩ সালে এই প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরের সময় টিউলিপ সিদ্দিককে ভ্লাদিমির পুতিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা এখন টিউলিপ সিদ্দিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যাচাই, ইমেইলের তথ্য যাচাই এমনকি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে ডাকতে পারে।
বাংলাদেশের সরকারি একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানিয়েছে, এনসিএ দল প্রস্তাব দিয়েছে যে, তারা ব্রিটেনে থেকেই টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবেন। যাতে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করতে পারে।
জানা যায়, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেগুলো যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তার ১০ বছর বা তারও বেশি সময়ের জেল হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনসিএ ব্রিটিশ হাইকমিশনের মাধ্যমে এই বৈঠকের অনুরোধ করেছিল। বাংলাদেশে গত আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দুইবার এনসিএ—এর কর্মকর্তারা ঢাকা সফর করেছেন।
সাবেক এই স্বৈরশাসককে টিউলিপ সিদ্দিক ‘রোল মডেল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অথচ, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। তাঁর শাসনামলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
এনসিএ গত অক্টোবরে প্রথমবার বাংলাদেশ সফর করে। সে সময় সংস্থাটি বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারকে সাহায্যের প্রস্তাব দেয়, যাতে শেখ হাসিনার সহযোগীদের দ্বারা বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। ওই বৈঠকে এনসিএর তিন সদস্যবিশিষ্ট দল বিশেষভাবে টিউলিপ সিদ্দিক সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই ডেইলি মেইল প্রকাশ করেছিল যে, বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের তদন্তের কারণে তিনি মন্ত্রী পদ ছেড়েছেন। এর কয়েক দিন পর জানা যায়, টিউলিপ সিদ্দিক লন্ডনের কিংস ক্রস এলাকায় দুটি বেডরুম বিশিষ্ট একটি ফ্ল্যাট উপহার হিসেবে পেয়েছেন, যা তার খালার ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশি ব্রিটিশ আবাসন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
আরও পড়ুন: অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করলেন টিউলিপ সিদ্দিক
