জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার সকাল ৯টায় ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের সংরক্ষিত নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মারকগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। এই জাদুঘর পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আগামী প্রজন্মের সামনে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ উন্মোচন করবে। এই জাদুঘর আমাদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর সাহসকে জাতীয় স্মৃতিতে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। আজকের এই দিনটি দেশের জন্য যুগান্তকারী মাইলফলক। সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের আমলে গুম-খুনকে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছিল। ইতিহাস স্বাক্ষী, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ চক্র দেশে গণতান্ত্রিক শাসন মেনে নিতে পারেনি। এদেরই পূর্বসূরিগণ ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল।’
জুলাই আন্দোলনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগষ্টের গণঅভ্যূত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পতিত পরাজিত বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা- এমন বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল।’
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন ও চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এই জাদুঘর শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের স্থান নয়, বরং নতুন বাংলাদেশ গঠনের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও কাজ করবে।’
নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমাদের চিন্তা ও কর্মে কোনো বিচ্যুতি দেখা দিলে এখানকার ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মত্যাগের গল্প নতুন করে দিকনির্দেশনা দেবে। পথ হারালে এই জাদুঘরে এসে পথ খুঁজে নেব। আমাদের চিন্তায় যদি কোনো গাফিলতি আসে, এখান থেকেই তার ঠিকানা খুঁজে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করবো।’
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘অনেক তরুণ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই নিজের অনুভূতি লিখে গেছেন। পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে কেন রাজপথে নেমেছিলেন, সেই কথাও তারা চিঠিতে তুলে ধরেছেন। এসব দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন বাংলাদেশ গঠনে অনুপ্রাণিত করবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের অন্তত একবার এই জাদুঘর পরিদর্শন করা উচিত। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা যেন এখানে এসে শুধু ইতিহাস দেখেই না ফিরে যায়, বরং নিজেদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও লিখে রেখে যায়।’
আজ উদ্বোধন করা হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে বলেও জানান উপদেষ্টা।
বর্তমান বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে অভ্যুত্থানের এবারের বর্ষপূর্তির মধ্যেই জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমে এসেছিল ছাত্র-জনতা। বিপুল গণরোষের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের শেষ দিন ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করেন। এরপর ক্ষুব্ধ জনতার স্রোত ঢুকে পড়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত গণভবনে। তাদের ক্ষোভের জেরে এত দিন কঠোর নিরাপত্তায় সুরক্ষিত থাকা ভবনটির সীমানাপ্রাচীর ও ভেতরের অনেক কিছু ধ্বংস হয়। উত্তেজিত জনতার একাংশ ভবনটি থেকে কিছু সামগ্রী নিয়েও যায়। এসব জিনিসপত্রের কিছু কর্তৃপক্ষ পরে উদ্ধার করে। আবার অনেকে স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দিয়ে যান।
জানা গেছে, জাদুঘরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের বিবরণ, ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও স্মারক, জুলাই শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী, গণভবনে পাওয়া নথিপত্র, ঐতিহাসিক স্মারক ও শিল্পকর্ম থাকবে। এ ছাড়া আছে তিন দিকে সম্প্রসারিত লেক, ফুডকোর্ট, প্রার্থনাকক্ষ, প্রক্ষালনকক্ষ, স্যুভেনিরের দোকান, ২২টি সেল নিয়ে তৈরি প্রতীকী আয়নাঘরের কাঠামো।
আরও পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ
