দীর্ঘ আট মাসের সংলাপ ও মতৈক্য প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত হওয়া ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। আজ শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এটি স্বাক্ষরিত হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানস্থলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ২৫টি দল ও জোটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়েছেন। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাও উপস্থিত আছেন। যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ।
জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জাতি আজ এক নবজন্মের সন্ধিক্ষণে। জুলাই সনদ স্বাক্ষরের ফলে বাংলাদেশের এক নতুন জন্ম হয়েছে এবং গণঅভ্যুত্থানের কারণে এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরকে অভ্যুত্থানের ‘দ্বিতীয় অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করে ড. ইউনূস বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ও কমিশন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, সারা বিশ্বের কাছে এটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।
জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের অবদানের মধ্য দিয়ে এই সনদ তৈরি হয়েছে। আশা করছি, জুলাই সনদের মাধ্যমে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার ভিত্তিক বাংলার গড়ার যাত্রা অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের এই সহসভাপতি বলেন, দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা, তার বাস্তবায়ন ছিলো জুলাই অভ্যুত্থান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এক দফায় রূপ নিয়েছে। তারই একটি স্মারক হলো এই জুলাই সনদ।
‘জুলাই সনদ’ দিয়ে ভবিষ্যত বাংলাদেশের পথ তৈরি হবে জানিয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আমাদের রাজনৈতিক মত ও পথের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু আমাদের এক জায়গায় এসে মিলতে হবে। যেকোনো স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। তারই প্রথম পদক্ষেপ এই জুলাই সনদ।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে বিএনপি নেতাদের মধ্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মধ্যে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর উপস্থিত রয়েছেন। তবে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘সনদের আইনি ভিত্তি না থাকা’র কথা উল্লেখ করে সনদ সাক্ষর করবে না বলে জানিয়েছে।
এছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যবসহ অনেক অতিথি উপস্থিত হয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রথম ধাপে গঠন করা ৬টি সংস্কার কমিশনের (সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন) সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রথম পর্বে ৩৩টি ও দ্বিতীয় পর্বে ৩০টি দলের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্য কমিশন।
এরপর গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দুই পর্বের আলোচনায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। গত ১৬ আগস্ট রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জুলাই সনদের খসড়া পাঠায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে ওই খসড়ায় কিছু ত্রুটি থাকায় তা সংশোধন করে নির্ভুল খসড়া পাঠানো হয়। এরপর গত ২০ আগস্ট ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে খসড়াটির ওপর যেকোনো ধরনের মতামত দেওয়ার সময় ২২ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এরপর আবারও জুলাই সনদের নানা বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ঘিরে রণক্ষেত্র সংসদ ভবন এলাকা
