শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪ | ৭ বৈশাখ, ১৪৩১ | ১০ শাওয়াল, ১৪৪৫

মূলপাতা জাতীয়

বৃটেনে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সাম্রাজ্য


রাজনীতি সংবাদ ডেস্ক প্রকাশের সময় :২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১১:৩১ : পূর্বাহ্ণ
সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ।
Rajnitisangbad Facebook Page

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের রিজেন্টস পার্ক এবং লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড থেকে হাতের নাগালে গড়ে উঠা একটি বাড়ির মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জানালা, বেশ কয়েকটি তলা জুড়ে একটি ঘুড়নো সিঁড়ি, একটি সিনেমা হল এবং একটি জিম দেখা যায়।

এই বাড়ির দাম ১.৩ কোটি পাউন্ড (১৮০ কোটি টাকার বেশি)। এর মালিক বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও সাবেক ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ।

শুধু এই বাড়ি নয়, মধ্য লন্ডনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বৃহত্তম আবাস টাওয়ার হ্যামলেটস এবং লিভারপুলে ছাত্রদের আবাসন পর্যন্ত বিস্তৃত জাভেদের সাম্রাজ্য। যার প্রায় ৯০ শতাংশ নতুন অবস্থায় কেনা হয়।

২০১৬ সাল থেকে বৃটেনে জাভেদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো প্রায় ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ৩৫০টিরও বেশি সম্পত্তির রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিষয়ক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

মিউনিসিপ্যাল ​​সম্পত্তির রেকর্ড অনুসারে, ব্লুমবার্গ ম্যানহাটানে জাভেদের অন্তত পাঁচটি সম্পত্তি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৬০ লাখ ডলার বা ৬৬ কোটি টাকায় এগুলো কেনা হয়।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, দেশটির কোনো নাগরিক, বাসিন্দা এবং সরকারি কর্মচারী বছরে ১২ হাজার ডলারের (১৩ লাখ ১৭ হাজার টাকার) বেশি অর্থ দেশের বাইরে নিতে পারেন না। বাংলাদেশের আইনে করপোরেশনের বিদেশে তহবিল স্থানান্তরেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। শুধু কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেসবাউল হক ব্লুমবার্গকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তির জন্য বিদেশে সম্পদ কেনার বিধান নেই। সাধারণ নিয়ম হিসেবে আমরা কোনো ব্যক্তিকে এটি করার অনুমতি দিই না।’

তবে জাভেদ বা তার স্ত্রী– কেউই বাংলাদেশের বাইরে তাদের সম্পত্তির মালিকানা বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য ব্লুমবার্গের অনুরোধের জবাব দেননি।

জাভেদ যুক্তরাজ্যের মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় ‘রাজনৈতিকভাবে উন্মোচিত ব্যক্তি’ বিভাগে নজরদারির আওতায় রয়েছেন। এ ধরনের ব্যক্তিরা সম্পত্তি কেনার মতো ব্যবসায়িক লেনদেনে জড়িত থাকলে তারা অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হন।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ গত জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ বছর ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় মোট ২.৪ মিলিয়ন ডলার সম্পদের কথা উল্লেখ করেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী। তার স্ত্রী রুখমিলা জামানের সম্পদ বলা হয় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ডলার। কিন্তু এতে তিনি বৃটেনে থাকা তার সম্পদের পরিমাণ ঘোষণা করেননি।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। দৃশ্যত এই কেলেঙ্কারির কারণে জাভেদ এবার এমপি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। তবে তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হয়েছেন।

ব্লুমবার্গ জাভেদের মালিকানাধীন কোম্পানির জন্য সম্পত্তি কেনায় জড়িত আর্থিক পরিষেবা এবং আইনি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। অন্যরা আবার বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অজুহাত দেখিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি কেনায় ৬৭০ কোটি পাউন্ড মূল্যের ‘সন্দেহজনক তহবিল’ চিহ্নিত করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১৪৯তম। অতি সম্প্রতি দেশটির রিজার্ভ ব্যাপকভাবে কমেছে। এ জন্য দায়ী কোভিড-১৯ মহামারি এবং মুদ্রাস্ফীতি।

তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষণায় বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাও রিজার্ভকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে। শুধু যুক্তরাজ্যে জাভেদের রিয়েল এস্টেট সম্পদ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্তত ১%।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ তার প্রয়াত পিতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। জাভেদ ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর তিনি আরামিট পিএলসি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির বিশিষ্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর জাভেদ ২০১৪ সালে ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকাকে বলেছিলেন, আমি খালি হাতে এসেছি এবং আমি খালি হাতেই যাবো। ২০১৯ সালে তাকে ভূমিমন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এটি।

আরও পড়ুন: বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল, সেই মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী

মন্তব্য করুন
Rajnitisangbad Youtube


আরও খবর