রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ | ৯ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪

মূলপাতা আঞ্চলিক রাজনীতি

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা দেবুর চাঁদাবাজি, গোপন ক্যামেরায় ধরা


বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশের সময় :২৫ আগস্ট, ২০২২ ১:৪৩ : অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি দেবাশীষ নাথ দেবু ও তার পাঁচ সহযোগী সাড়ে ছয় বছর আগে নগরীর একটি রেস্টুরেন্টে বসে এক ব্যক্তির নিকট থেকে চেকের মাধ্যমে ৭০ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য তখন সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি তার গোপন ক্যামেরায় ধারণ করেন।

ক্যামেরায় ধারণকৃত ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজটি সম্প্রতি রাজনীতি সংবাদের হাতে আসে।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে নগরীর ষোলশহর চিটাগং শপিং কমপ্লেক্সের পাশে পুরনো একটি ভবনসহ ১২ কাঠা জায়গা কিনেছিলেন কুয়েত প্রবাসী বন্ধন নাথ। এরপর তিনি ওই ভবনটি ভাড়া দেন। চট্টগ্রাম নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি দেবাশীষ নাথ দেবু সম্পর্কে তার ভাগিনা। আত্মীয়তার সুবাদে তাকে ওই ভবনের কেয়ার টেকারের দায়িত্ব দেন বন্ধন নাথ। কিন্তু সেখানে আশ্রয় পেয়ে রাতারাতি রূপ পাল্টে ভবনটির মালিক বনে যান দেবু! ভবনটি দখলে নিয়ে নাম দেন ‘দেব ভবন’। ৮ বছর ধরে ভবনের ৩০টি কক্ষের ভাড়ার টাকা তিনি নিজের পকেটে ভরতেন।

এ অবস্থায় সেই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ‘ডিজাইন সোর্স টিম লিমিটেড’ নামে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেন বন্ধন নাথ। দুই দিন পর তিনি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটিকে জায়গাটি বুঝিয়ে দিতে গেলে তাতে বাধ সাধেন দেবু ও তার পাঁচ সহযোগী-এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম রতন, আবু নাছের চৌধুরী আজাদ, একেএম নাজমুল আহসান, মো. ইদ্রিস মিয়া ও মো. ইমরান হোসেন জিয়া।

সেদিন তারা বন্ধন নাথকে ভবনটির ভেতর আটকে রাখেন। এরপর তার কাছে তারা ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু তিনি চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে দেবু ও তার সহযোগীরা তাকে বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে বন্ধন নাথের পিঠের ডান পাশে গুলি করা হয়।

এরপর তারা ব্যবসায়িক লেনদেন বাবদ বন্ধন নাথের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা পাওনা আছে বলে জোরপূর্বক তিনটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন।

এ ঘটনার তিনদিন পর বন্ধন নাথ প্রাণনাশের হুমকির ভয়ে দেবু ও তার পাঁচ সহযোগীকে ৭০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে রাজি হন।

বন্ধন নাথের পক্ষে ডিজাইন সোর্সের এমডি মেহেদী ইফতেখার তার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রাইম ব্যাংকের লালদীঘি শাখা চট্টগ্রাম (হিসাব নম্বর ১৪৫১১০১০০১৬৫৯৫) হতে দেবু ও তার পাঁচ সহযোগীকে ৭০ লাখ টাকার বিপরীতে পাঁচটি চেক প্রদান করেন।

ওই দিন সন্ধ্যায় বন্ধন নাথ আতঙ্কিত হয়ে দেশ ছেড়ে কুয়েত চলে যান।

কিন্তু ৭০ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েও ক্ষান্ত হননি দেবু ও তার সঙ্গীরা।

দুই বছর পর ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ডিজাইন সোর্স টিম লিমিটেড ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি যখন ওই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন, তখন দেবুর নেতৃত্বে তার সঙ্গীরা আবার সেখানে হানা দেন। নির্মাণ কাজে বাধা দিয়ে তারা আরও ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।

এ খবর জানতে পেরে বন্ধন নাথ কুয়েত থেকে দেশে এসে ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নগরীর পাঁচলাইশ থানায় দেবু ও তার পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর সাগরিকা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দেবাশীষ নাথ দেবু ও এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম।

ওই বছরের ১৮ মার্চ জেলগেটে দেবাশীষ নাথ দেবু ও মঞ্জুরুল ইসলামকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওয়ালী উদ্দিন আকবর।

জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি বন্ধন নাথের কাছ থেকে ব্যবসায়িক লেনদেন বাবদ ৭০ লাখ টাকা পাওনার বিষয়ে কোনো তথ্য প্রমাণ দিতে পারেননি। একপর্যায়ে তারা বন্ধন নাথের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আদালতে এ মামলার আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করা হয়।

গত ২১ আগস্ট চট্টগ্রাম পঞ্চম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

গোপন ক্যামেরার ফুটেজে যা দেখা গেছে

ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, ডিজাইন সোর্স টিম লিমিটেডের এমডি মেহেদী ইফতেখারকে একটি রেস্টুরেন্টে বসে দেবাশীষ নাথ দেবু ও তার সহযোগীদের চেক প্রদান করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাড়ে ছয় বছর আগে নগরীর গোলপাহাড় মোড় এলাকায় ‘স্পিলিটস ভিলা কাবাব হাউজ’ নামে রেস্টুরেন্টে তারা বসেছিলেন। তবে সেই রেস্টুরেন্টটি এখন সেখানে নেই।

ফুটেজে দেখা যায়, ডিজাইন সোর্সের এমডি মেহেদী ইফতেখার (হালকা নীল রঙের ফুলহাতা শার্ট পরা) টেবিলের ওপর চেকবইয়ে গ্রহীতার নাম, তারিখ ও টাকার অঙ্ক লিখছিলেন। তার ডানপাশে বসা ছিলেন দেবাশীষ নাথ দেবু (লাল বৃত্ত চিহ্ন)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ সময় রেস্টুরেন্টটিতে দেবাশীষ নাথ দেবুসহ তার পাঁচজন সহযোগী এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম রতন, আবু নাছের চৌধুরী আজাদ, একেএম নাজমুল আহসান, মো. ইদ্রিস মিয়া ও ইমরান হোসেন জিয়া উপস্থিত ছিলেন।

তবে ক্যামেরার ফুটেজে পাঁচজনের মধ্যে দেবাশীষ নাথ দেবু, মঞ্জুরুল ইসলাম রতন, নাজমুল আহসান ও ইমরান হোসেন জিয়ার উপস্থিতি দেখা যায়। বাকি দুজনকে ফুটেজে দেখা যায়নি।

মঞ্জুরুল ইসলাম রতন বসেছিলেন মেহেদী ইফতেখারের সামনে (সাদা ফুলহাতা শার্ট পরিহিত)। আর নাজমুল আহসান বসেছিলেন দেবুর ডানপাশে (সাদা ফুলহাতা শার্ট ও চোখে চশমা পরিহিত)।

ফুটেজে দেখা যায়, চেকে গ্রহীতার নাম লেখা নিয়ে মেহেদী ইফতেখারের সঙ্গে দেবু ও তার পাঁচ সহযাগীর মধ্যে কিছুটা তর্ক-বিতর্ক হয়।

মেহেদী ইফতেখার চেক লেখার সময় কেউ একজন এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম রতনের বাবার নামে চেক লিখতে বলেন। এতে আপত্তি করেন মেহেদী ইফতেখার।

তিনি বলে উঠেন, ‘না না, প্রশ্নই উঠে না, ডিড (দলিল) যার নামে তার নামে।’

এ সময় দেবাশীষ নাথ দেবু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে উঠেন, ‘একেক নামে দেউক। পইলে নাজমুল ভাইয়ের নামে ওগ্যো লেহক, এইল্যে গ্যর, তারপর তোর (মঞ্জুরুল ইসলাম) নামে ওগ্যো লেহক, বেগ্গিন একনামে ন লেক না।’ (একেক নামে দেওয়া হোক। প্রথমে নাজমুল ভাইয়ের নামে একটা লেখুক। এরকম করো। তারপর তোমার (মঞ্জুরুল ইসলাম) নামে একটা লেখুক, সব একনামে লিখিয়ো না।)

তখন মঞ্জুরুল ইসলাম রতন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় দেবুকে বলেন, ‘হতা ন বুঝেন তো অনে (কথা বুঝেন নাই আপনি)। ডিড যার নামে যেটা সেটা লেখুক।’

এ সময় বন্ধন নাথের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া দলিলগুলো হাতে নিয়ে দেবু বলেন, ‘সবার নাম এখানে আছে তো। সবার নামে একটা একটা (চেক) দেন না।’

তখন মেহেদী ইফতেখার বলেন, ‘যার নামে চুক্তি তারে দিতে হবে।’

এ সময় নাজমুল আহসান বলে উঠেন, ‘এটা কোনো ব্যাপারই না।’

মেহেদী ইফতেখার তখন নাজমুল আহসানকে বলেন, ‘আমাকে যেভাবে বলা হয়েছে। আমারে ভুল বুঝিয়েন না, প্লিজ। উনারা (বন্ধন নাথ) অনেক দূরে থাকে। আপনাদের বুঝতে হবে কথাটা। আমার আর আপনার লেনদেন হলে যা খুশি আমি করতে পারি। টাকাগুলো বাইরে থেকে আসবে।’

চেক প্রদান শেষে মেহেদী ইফতেখার বলেন, ‘ঠিক আছে তাহলে, বেস্ট অব লাক। এভরিওয়ান হ্যাপি?’

এ সময় মঞ্জুরুল ইসলাম রতন তার কাছে জানতে চান, ‘ওটা কী বলছেন বুঝাই দেন…’

তখন মেহেদী ইফতেখার বলেন, ‘১৪ তারিখে চেক জমা দিবেন…১৫ তারিখে চেক ক্লিয়ারিং হয়ে যাবে।’

এ সময় মঞ্জুরুল ইসলাম রতন বলেন, ‘আমি কথা ওটা বুঝি। ১৪ তারিখে যদি আমি চেক প্রেস করি তাহলে ২টা বাজে গিয়ে হিট করবে।’

তখন মেহেদী ইফতেখার বলেন, ‘১৪ তারিখে আপনি প্রেস করবেন, ১৫ তারিখে ক্লিয়ারিং….’

মঞ্জুরুল ইসলাম রতন বলেন, ‘না, না ১৪ তারিখে ওর (বন্ধন নাথ) চেকটা জমা হচ্ছে কিনা? ব্যাপারটা বুঝিয়েন…’

তখন মেহেদী ইফতেখার বলেন, ‘একটা ভালো কথা বলি। উনি (বন্ধন নাথ) ১৪ তারিখে মাস্ট জমা (টাকা) করে দিচ্ছে আমাকে। আপনি ১৫ তারিখে…’

এ সময় দেবাশীষ নাথ দেবু বলে উঠেন, ব্যাস, ‘এই রতন ভাই বুঝছি।’

তখন মঞ্জুরুল ইসলাম রতন বলেন, ‘আমি ব্যাপারটা কেন বলতেছি..যদি আমি ১৪ তারিখে দিয়া দুপুর ২টায় কিন্তু হিট করবে..দুপুর ২টায় হিট করলে ওর অ্যাকাউন্টে যদি টাকা না থাকে তাহলে চেক ডিজঅনার হবে।’

এ সময় দেবাশীষ নাথ দেবু বলে উঠেন, ‘এ জন্য ১৪ তারিখে হিট করতে হবে, রতন ভাইয়ের কথা ঠিক আছে।’

ফুটেজে দেখা যায়, দেবাশীষ নাথ দেবু তার চেক ভাঁজ করে বাম হাতে নিয়ে তা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন।

মামলার চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ৫ মে আসামি দেবাশীষ নাথ দেবু ১৫ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেন। সেই চেকটি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী প্রাইম ব্যাংক শাখায় তার ব্যক্তিগত একাউন্টে (হিসাব নম্বর: ১৩৬২১০৮০০০১৫১৮) জমা হয়।

তবে এটিএম মঞ্জুরুল ইসলাম রতন, আবু নাছের চৌধুরী আজাদ, একেএম নাজমুল আহসান, মো. ইদ্রিস মিয়া ও মো. ইমরান হোসেন জিয়া তাদের নামে ইস্যুকৃত চেকগুলো পরে মেহেদী ইফতেখারের কাছে জমা দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে যান।


আরও খবর