বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২২ | ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ | ১৩ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪

মূলপাতা আঞ্চলিক রাজনীতি

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আ’লীগ: ‘ত্যাগীরা’ সদস্য, ‘হাইব্রিডরা’ সম্পাদক


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় :১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ৯:০০ : অপরাহ্ণ

আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে সংগঠনের একাংশের নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নেতাদের অভিযোগ, আগের কমিটির সভাপতিমন্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীতে থাকা অনেক ত্যাগী নেতাকে নতুন কমিটিতে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে সদস্য পদে; আবার অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্র থেকে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ৭৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে এম এ সালাম সভাপতি ও শেখ আতাউর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনের ১ বছর ২ মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ৭৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকায় ত্যাগী নেতাদের স্থান না দেওয়ার অভিযোগে জেলা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতারা ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করে নালিশ দিয়ে আসেন। কিন্তু এরপরও অসন্তুষ্ট নেতাদের কমিটিতে মূল্যায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘কমিটিতে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। যে যার যোগ্যতা অনুযায়ী কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। যারা বাদ পড়েছেন ভবিষ্যতে দল তাদের মূল্যায়ন করবে।’

প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিটি নিয়ে যারা অসন্তুষ্ট ছিলেন তারা কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। এখন কেন্দ্রই যাচাই-বাছাই করে কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। এখানে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই।’

দলীয় সূত্রের খবর, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জেলার সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

নেতাদের অভিযোগ, কমিটি গঠনের সাথে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন তারা তাদের পছন্দের লোকদের মূল্যায়ন করেছেন আর অপছন্দের লোকদের অবমূল্যায়ন করেছেন। কমিটিতে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার নিকটাত্মীয়কে স্থান দেওয়া হয়েছে। কমিটি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন অনেক নেতা।

দলীয় মহল থেকে জানা গেছে,  উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে শেখ আতাউর রহমানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা গিয়াস উদ্দিনকে নতুন কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে ৬ নম্বর সদস্য পদে। তিনি আগের কমিটিতে ৩ নম্বর সদস্য ছিলেন। সম্মেলনে গিয়াস উদ্দিনের প্রস্তাবকারী নুরুল হুদা ও সমর্থনকারী মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। তারা আগের কমিটিতে সদস্য পদে ছিলেন।

উল্লেখ্য, মিরসরাইয়ের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিনের সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ দিনের মতবিরোধ রয়েছে। শেখ আতাউর রহমান সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত।

গিয়াস উদ্দিন রাজনীতি সংবাদকে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রোষানলে পড়েছি। আমার প্রস্তাবকারী নুরুল হুদা ও সমর্থনকারী মঞ্জুরুল আলমকেও জবাই করে দিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যে তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন সেটাই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।কমিটিতে তারা তাদের অপছন্দের লোকদের কাউকে অবমূল্যায়ন করেছেন আর কাউকে বাদ দিয়েছেন।’

আগের কমিটিতে ৩ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক পদে থাকা ইউনুচ গণি চৌধুরী নতুন কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন ৮ নম্বর সদস্য পদে। এটাকে একপেশে কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি।

কমিটি নিয়ে বাণিজ্য হয়েছে অভিযোগ করে ইউনুচ গণি চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। যারা জীবনে কোনো দিন আওয়ামী লীগ করেনি তাদেরকে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির ব্যবসায়িক পার্টনার আফতাব খান অমি কোষাধ্যক্ষ ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) নুর খান দপ্তর সম্পাদক পদ পেয়েছেন। যারা উত্তর জেলার নতুন নেতৃত্ব চেয়েছে কমিটিতে তাদের কাউকে অবনতি আর কাউকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের কমিটির সহসভাপতি সিরাজউদ্দৌলা চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদুল আলম বাবু, শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক ফখরুল আনোয়ার, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ভবতোষ নাথ, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সুরাইয়া বাকের, সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুচ, নুরুল হুদা, মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী এবং শাহ নেওয়াজ চৌধুরী নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। তবে নতুন কমিটির সদস্য পদে মৃত মোহাম্মদ আলী খসরু নামের এক নেতার নাম রয়েছে।

নতুন কমিটিতে জায়গা না পাওয়া সিরাজউদ্দৌলা চৌধুরী রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমি কারো ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়ে কমিটিতে স্থান পায়নি। না হয় আমাকে মাইনাস করার কোনো কারণ দেখছি না।’

কমিটির সম্পাদকমন্ডলীর বিভিন্ন পদে অনেক নতুন মুখ স্থান পেয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, সম্পাদক মন্ডলীতে স্থান পাওয়া অনেক নেতা স্থান পেয়েছেন পিতার পরিচয়ে। নতুন মুখ হিসেবে স্থান পাওয়া নেতাদের অনেকেই হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারী।

দলীয় মহল থেকে জানা গেছে, কমিটিতে এক নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক পদে স্থান পাওয়া সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি হলেন ফটিকছড়ির সাবেক সাংসদ প্রয়াত রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে। দপ্তর সম্পাদক পদে স্থান পাওয়া নুর খান হলেন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাবেক এপিএস।

কমিটির দুই নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন বাবুল রাজনীতি সংবাদকে বলেন, ‘আমার রাজনীতির বয়স হবে না খাদিজাতুল আনোয়ার সনির। তিনি কীভাবে এক নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন তা আমার বোধগম্য নয়।’

কমিটিতে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার প্রিয়াংকা আহসান প্রিয়া হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের ভাতিজি। তিনি গত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে নোমানের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। কমিটির সদস্য পদে স্থান পাওয়া সরোয়ার হাসান জামিল ওরফে শামীম বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর ভায়রা।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, কোষাধ্যক্ষ আফতাব খান অমি, দপ্তর সম্পাদক নুর খান, উপ-দপ্তর সম্পাদক ইয়াছিন মাহমুদ, আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, সদস্য মনজুর মোরশেদ ফিরোজ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক প্রদীপ চক্রবর্তী, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেবুন নেছা জেসি, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার প্রিয়াংকা আহসান প্রিয়া, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মেজবাহ উল আলম লাভলু এবং সরোয়ার হাসান জামিল ওরফে শামীম কখনও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা তাদেরকে হাইব্রিড নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, কমিটিতে স্থান পাওয়া দুয়েকজন নেতা জেলা আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস কোথায় সেটাও জানবেন না। অনেক নেতা তো জীবনে দলের কোনো কর্মসূচিতেও অংশ নেননি।

আগের কমিটিতে বন ও পরিবেশ সম্পাদক কামরুল ইসলাম এবং শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক বেদারুল আলম চৌধুরী নতুন কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন সদস্য পদে।


আরও খবর