মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২ | ২১ আষাঢ়, ১৪২৯ | ৫ জিলহজ, ১৪৪৩

মূলপাতা আইন-আদালত

অভিযোগপত্রের বরাতে র‍্যাব

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেই সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেন ওসি প্রদীপ


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় :১৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ৭:১৮ : অপরাহ্ণ

মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ যে অবৈধ মাদক বাণিজ্য ও ভয়ভীতি-নির্যাতনের পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন, সেটি মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান জেনে ফেলেছিলেন। তাই টেকনাফের বাহাছড়ায় মেজর সিনহাকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেই মেজর সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেন ওসি প্রদীপ।

সিনহা হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করার পর মামলার তদন্তকারী সংস্থা র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এমনটাই দাবি করেছে।

আজ রোববার (১৩ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক তামান্না ফারাহর আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এরপর বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে অভিযোগপত্র নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সংস্থার আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন।

র‍্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মূল যে বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবেই আদালতের নজরে এনেছেন সেটি হলো, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রত্যক্ষদর্শী, বিভিন্ন পর্যায়ের সাক্ষীর সাক্ষ্য, আলামত ও আসামিদের জবানবন্দিসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এই মর্মে বস্তুনিষ্ঠভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ঘটনাটি ঘটেছিল ৩১ জুলাই রাত ৯টা ২৫ মিনিটে বাহারছাড়া তদন্তকেন্দ্রে। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক ছিলেন তৎকালীন টেকনাফ থানার থানার ওসি প্রদীপ। তার নির্দেশেই পরিদর্শক লিয়াকত টেকনাফের বাহারছড়া চেকপোস্টে মেজর সিনহাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে তিনি সময় ক্ষেপণের জন্য তাকে হাসপাতালে পাঠান। হত্যার পরে বাহারছড়া ক্যাম্পের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ বাকি আসামিদের নিয়ে মাদক উদ্ধারের নাটক সাজান ওসি প্রদীপ। ওই রাতের নীলিমা রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করে সিনহার সঙ্গীদের আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়।

সিনহা মো. রাশেদ হত্যার ঘটনায় শিপ্রা দেবনাথ ও সিফাতের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা দুই মাদক মামলার সত্যতা পায়নি তদন্ত কর্মকর্তা- এই মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা তিনটি মামলার সত্যতা পাওয়া যায়নি।

কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ওসি প্রদীপ এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এবং বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রে পরিদর্শক লিয়াকত আলীর সঙ্গে আরো পাঁচজন অর্থাৎ পুলিশের সোর্স মো. নুরুল আমিন, মো. আইয়াত ওরফে আইয়াজ, মো. নিজামউদ্দিন ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেন। লিয়াকত আলী কর্তৃক ও এসআই নন্দ দুলালের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এবং তিনজন এপিবিএনের সদস্যের সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করেন।

কর্নেল আশিক বিল্লাহ আরো বলেন, মূলত দুটি কারণে ওসি প্রদীপ এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার একটি হলো, ওসি প্রদীপের যে বাণিজ্য, নিজস্ব একটি অভয়াশ্রম তৈরি করেছিলেন, সেই অভয়াশ্রমকে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা এবং এসব বিষয়ে যেহেতু সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান সম্মুখভাবে সব জেনে ফেলেছিলেন, এ বিষয়টি যাতে কর্তৃপক্ষকে না জানান। এই দুটি বিষয়কে সামনে রেখে ওসি প্রদীপ তাদের প্রত্যক্ষ হুমকি প্রদান করেন। কিন্তু সিনহাসহ তাঁর সহযোগীরা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে পরিদর্শক লিয়াকত ও প্রদীপসহ তার সোর্সরা মিলে এ ধরনের একটি ন্যক্কারনজক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন।

এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা কবের এবং কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পনাটি মধ্য জুলাইয়ের। সিনহা মো. রাশেদ বন্ধুবৎসল ছিলেন। টেকনাফে তাঁর ইউটিউব চ্যানেল চালুর অংশ হিসেবে গিয়েছিলেন। দ্রুতই তাঁর সঙ্গে এলাকাবাসীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তিনি টেকনাফের মানুষের ওপর প্রদীপ কুমার দাশের নির্যাতন–নিপীড়নের কথা জানতে পারেন। ইয়াবা বড়ি কেনাবেচায় সম্পৃক্ততারও প্রমাণ পান। এমন কিছু তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, যেগুলো প্রকাশ পেলে প্রদীপ কুমার দাশ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যেতে পারতেন। এসবের ভিত্তিতে তিনি টেকনাফ থানায় প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার নিতে যান। এ সময় প্রদীপ কুমার দাশ তাঁদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার কথা বলেন এবং সরাসরি হুমকি দেন। কিন্তু সিনহা তাঁর কাজ চালিয়ে চান। পরে প্রদীপ থানাতেই উপপরিদর্শক লিয়াকত ও তিন তথ্যদাতার সঙ্গে বৈঠক করেন। হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেও প্রদীপই নির্দেশ দেন।

গত ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে আলোচিত মামলাটির অভিযোগপত্র আজ দাখিল করেছে র‍্যাব।

এদিকে আজ সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলা বাতিল চেয়ে প্রধান আসামি বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর পক্ষে করা রিভিশন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। উভয়পক্ষের যুক্ততর্ক ও শুনানি শেষে আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় খারিজ করে দেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল।

মেজর সিনহা হত্যার পর গত ৫ আগস্ট তাঁর বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশসহ নয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয় টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিতকে।


Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

আরও খবর