বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২২ | ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ | ১৩ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪

মূলপাতা অন্যান্য দল

৬০ সংগঠনের বিক্ষোভে উত্তাল ঢাকা

বাবুনগরী-মামুনুলকে গ্রেপ্তার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবি


রাজনীতি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় :২ ডিসেম্বর, ২০২০ ১২:২৮ : পূর্বাহ্ণ

বঙ্গবন্ধু ও সংবিধান অবমাননার অভিযোগে হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী ও যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের গ্রেপ্তার দাবিতে মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) উত্তাল ছিল রাজধানী ঢাকা। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে বিশাল মানববন্ধন করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবীদের ৬০টি সংগঠন। দেশজুড়ে কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীতে নাগরিক সমাজের বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধের দাবিও জানানো হয়েছে।

রাজধানীর ধোলাইরপাড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতাকারীরা বঙ্গবন্ধু ও সংবিধানকে অবমাননা করেছে মন্তব্য করে তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান বক্তারা। এছাড়া সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাম্প্রদায়িক ভাষণ নিষিদ্ধ করা, পহেলা ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করারও দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভাস্কর্য একটি দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর সব মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য আছে। কিন্তু বাংলাদেশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘একটি গোষ্ঠী’ ভাস্কর্যবিরোধী ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিচ্ছে। এই গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এটি চরম ধৃষ্টতা ও জাতির পিতা, সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা। এই গোষ্ঠীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তারপরও তারা যদি ধৃষ্টতা দেখায়, তবে তাদের এর পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

মানববন্ধন ও সমাবেশে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান। এতে বলা হয়, বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত হেফাজত-খেলাফতের মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক নেতারা ওয়াজের নামে সমাবেশ করে ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে তারা পাকিস্তান ও তালেবানি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান।

রাজধানীতে নাগরিক সমাজের সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বিশিষ্টজনরা বলেন, ভাস্কর্য বিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দেশে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এর পিছনে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

ওয়াজ মাহফিলসহ বিভিন্ন সমাবেশে ভিন্নমতের প্রতি বিষোদগার করা হচ্ছে অভিযোগ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইনশৃংখলাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তব্য প্রদানকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘জাতির পিতার ভাস্কর্য সম্পর্কে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি ঘৃণা ও ক্ষোভ জানানোর কোনো ভাষা খোঁজে পাচ্ছি না। তাদের (হেফাজত নেতাদের) উচিত বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করা। অন্যথায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা উপযুক্ত জবাব দেবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘অপ্রত্যাশিতভাবে আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি, কতিপয় ধর্মান্ধ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। আমি তাদের এ অবস্থানের প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তাদের সতর্ক করছি যে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারী কাউকে আমাদের জনগণ ছাড়বে না।’

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক আবেদ খান, ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক মুনতাসীর মামুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

রাজধানীর মৎস্য ভবন থেকে শুরু হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, শাহবাগ মোড় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাট পর্যন্ত দীর্ঘ হয় এই সম্মিলিত মানববন্ধন কর্মসূচি।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের মানববন্ধন থেকে বক্তারা বলেন, সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মৌলবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিচ্ছে।

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘সংবিধানেই রয়েছে যে জাতির পিতার বিরুদ্ধে যদি কোনো কটূক্তি করা হয়, কোনো অসম্মান প্রদর্শন করা হয়, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার। অবিলম্বে আইনের আওতায়, সংবিধানের আওতায় এইসব দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরে কয়েক হাজার নেতাকর্মী নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, ‘এবার যখন আমরা ধরব, ফাইনাল হয়ে যাবে। এবার আর কোনো কম্প্রোমাইজ (আপস) নয়। আমরা মাঠে আছি, দেখে নেব তাদের। চোরের ১০ দিন, গেরস্তের এক দিন। আমরা এবার তাদের দেখে নেব। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে নির্মূল করা হবে।’ এজন্য দলীয় নেতাকর্মীদের সোচ্চার থাকার আহ্বান জানান তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘আমাদের কাজ হচ্ছে, জাতির পিতাকে যারা অবমাননা করেছে তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে চিরদিনের জন্য বিতারিত করতে হবে।’

নাট্যব্যক্তিত্ব পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই ডিসেম্বর মাসের মধ্যে আমরা এই রাজাকারদের, এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীদের, সরকারের শত্রুদের, সংবিধানের শত্রুদের নির্মূল করবই।’


আরও খবর