সোমবার, ৪ জুলাই, ২০২২ | ২০ আষাঢ়, ১৪২৯ | ৪ জিলহজ, ১৪৪৩

মূলপাতা আইন-আদালত

যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর, যুদ্ধাপরাধী ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়: আপিল বিভাগ


রাজনীতি সংবাদ ডেস্ক প্রকাশের সময় :১ ডিসেম্বর, ২০২০ ৩:২৯ : অপরাহ্ণ

যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ ৩০ বছর করে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে কোনো আদালত আমৃত্যু কারাদণ্ড দিলে এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার ক্ষেত্রে ৩০ বছর কারাদণ্ড প্রযোজ্য হবে না।

আজ মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে আমৃত্যু কারাবাস বলে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউর রায়ে এ মতামত দেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এ রায় দেন। এর আগে ২০১৯ সালের ১১ জুলাই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায়টি অপেক্ষমাণ রাখেন।

ঘোষিত রায়ে বলা হয়, প্রাথমিক অর্থে যাবজ্জীবন কারাবাস মানে কোনো দণ্ডিতের বাকি জীবন। ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধির এ-সংক্রান্ত বিধানগুলো একসঙ্গে পড়লে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছরের কারাবাস। তবে আদালত, ট্রাইব্যুনাল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কাউকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলে সেই দণ্ডিত ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫-এ ধারার সুবিধা পাবেন না।

রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষে আদালতে যুক্ত ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও আইনজীবী শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, যাবজ্জীবন মানে আসামিকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর সাজা খাটতে হবে। তবে আদালত যদি আমৃত্যু সাজা দেয়, তাহলে সেটাই গণ্য করতে হবে উল্লেখ করে রিভিউ রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
যাবজ্জীবনে ৩০ বছর- এ নিয়ম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের মামলায় দণ্ডিত আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, বর্তমান আইনের বিধানে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড। কেননা ৩০ বছর যদি না হয়, আইনের অন্য বিধানগুলো যেমন ৩৫-এ, জেলকোড সব বাতিল হয়ে যাবে। আজকের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, যদিও যাবজ্জীবন বলতে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন যতদিন ততদিন। কিন্তু আইনের বিধান অনুযায়ী, একজন যাবজ্জীবন আসামির সাজা ৩০ বছর ভোগ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আইনের অন্যান্য রেয়াত যেগুলো আছে, ৩৫-এসহ অন্যান্য রেয়াত পাবে। যদি না আদালত বিশেষভাবে আদেশ দেন তাকে আমৃত্যু জেলখানায় থাকতে হবে।’

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০১ সালে সাভারে জামান নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ২০০৩ সালে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। হাইকোর্টে আপিলের পর বিচারিক আদালতের দণ্ড বহাল থাকে। এর বিরুদ্ধে আপিলের পর ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আসামিদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন সর্বোচ্চ আদালত। মামলার ৯২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ওই বছরের ২৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড। রায়ে আরো বলা হয়, যদি হাইকোর্ট বিভাগ বা এই আদালত (আপিল বিভাগ) মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন তখন এবং নির্দেশ দেন যে আসামি স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত এই কারাদণ্ড ভোগ করবেন, তখন এ ধরনের মামলায় সাজা কমানোর আবেদন গ্রাহ্য হবে না।

আদালতের এ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাপর আসামির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও কারা মহাপরিদর্শককে বলা হয়। পরে ওই বছরই আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রিভিউ করেন জামান হত্যা মামলার আসামি আতাউর রহমান মৃধা।

এ রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানিকালে আপিল বিভাগ উভয়পক্ষের আইনজীবী ছাড়াও অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ চার আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও সমিতির বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিনের যুক্তি শোনেন।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক) ধারা এবং কারাবিধির ৫৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে ৩০ বছর। রেয়াত শেষে যা দাঁড়ায় সাড়ে ২২ বছর।

অপরদিকে সূর্য বেগম হত্যা মামলায় রোকেয়া বেগমকে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল আপিল বিভাগ রায় দেন। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ সাড়ে ২২ বছর কারাদণ্ড (১৯ বিএলসি, পৃষ্ঠা ২০৪)।

আপিল বিভাগের এ রায় ও আইন বলবৎ থাকাবস্থায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সাভারের জামান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আতাউর রহমানের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অর্থ আমৃত্যু কারাদণ্ড।

ভারতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হিসেবে আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান করে আইন করা হয়েছে। ভারতের মতো যদি পরিবর্তন করতে হয় তবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫(ক), ৪০১ ও ৪০২ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৫৫ ধারা এবং কারাবিধির ৫৯ নম্বর ধারা সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে।


Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

আরও খবর